
ফুটবল মাঠে একটি ভুল পাস শুধরে নেওয়ার সুযোগ থাকে। গোলরক্ষকের হাত ফসকে যাওয়া বলের জবাব দেওয়া যায় পরের সেভে। এমনকি পেনাল্টি মিস করেও কোনো খেলোয়াড় ম্যাচের নায়ক হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু রেফারির একটি ভুল সিদ্ধান্ত কখনও কখনও আর সংশোধনের সুযোগ দেয় না। একটি কার্ড, একটি বাতিল গোল কিংবা ভিএআরের কয়েক সেকেন্ডের পর্যালোচনা চার বছরের প্রস্তুতি শেষ করে দিতে পারে। খেলোয়াড়েরা দেশে ফিরে যান, দর্শকেরা তর্ক করতে থাকেন, আর স্কোরবোর্ডে থেকে যায় এমন একটি ফল, যা পরে ভুল প্রমাণিত হলেও আর বদলায় না।
২০২৬ বিশ্বকাপ মাঠের নৈপুণ্য, নাটকীয়তা ও নতুন চ্যাম্পিয়নের গল্প উপহার দিয়েছে। একই সঙ্গে রেখে গেছে রেফারিংয়ের অসংগতি, ভিএআরের সীমা লঙ্ঘন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বড় দলের প্রতি পক্ষপাতের অভিযোগ। সর্বশেষ, সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলোর লাল কার্ডকে ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা আইএফএবি ভুল বলে স্বীকার করার পর অন্য বিতর্কগুলোও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সবচেয়ে আলোচিত ভুলটি ঘটে আর্জেন্টিনা ও সুইজারল্যান্ডের কোয়ার্টার ফাইনালে। ম্যাচের ৭২তম মিনিটে খেলা ১-১ সমতায় থাকা অবস্থায় আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো প্যারেদেসের সঙ্গে সংঘর্ষে পড়ে যান এমবোলো। রেফারি জোয়াও পিনেইরো প্রথমে প্যারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান। কিন্তু ভিএআর থেকে জানানো হয়, প্যারেদেস ফাউল করেননি। এরপর রেফারি তাঁর সিদ্ধান্ত পাল্টে এমবোলোকে ডাইভিংয়ের অভিযোগে হলুদ কার্ড দেখান। আগে একটি কার্ড থাকায় সেটিই হয়ে যায় এমবোলোর বিদায়ের কারণ।
১০ জনের সুইজারল্যান্ড অতিরিক্ত সময়ে দুটি গোল হজম করে ৩-১ ব্যবধানে হেরে যায়। কোচ মুরাত ইয়াকিন তখনই বলেছিলেন, সিদ্ধান্তটি তাঁদের ম্যাচের পরিকল্পনা ধ্বংস করে দিয়েছে।
বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর আইএফএবি জানায়, ভিএআরের এ ধরনের ব্যবহার বৈধ ছিল না। ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’ বা ভুল খেলোয়াড় শনাক্তকরণের নিয়ম ব্যবহার করে কার্ড পাওয়া খেলোয়াড়ের পরিচয় সংশোধন করা যায়, কিন্তু ভিএআর দিয়ে মূল অপরাধটিই বদলে দেওয়া যায় না। অর্থাৎ প্যারেদেসের হলুদ কার্ড বাতিল করে এমবোলোকে ডাইভিংয়ের কার্ড দেওয়ার আইনগত সুযোগ ছিল না। ভুলটি স্বীকৃত হলো, কিন্তু সুইজারল্যান্ডের হার কিংবা হারিয়ে যাওয়া সেমিফাইনাল আর ফিরল না।
গ্রুপ পর্বে যুক্তরাষ্ট্র ও প্যারাগুয়ের ম্যাচেও একইভাবে ‘মিসটেকেন আইডেন্টিটি’ নিয়ম প্রয়োগ করা হয়েছিল। প্যারাগুয়ের মিগেল আলমিরোন পড়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের টিম রিমকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি ড্যানি ম্যাকেলি। পরে ভিএআর পর্যালোচনায় রিমের কার্ড বাতিল করে আলমিরোনকে ডাইভিংয়ের অভিযোগে হলুদ কার্ড দেওয়া হয়।
দৃশ্য দেখে মনে হয়েছিল প্রযুক্তি একটি ভুল শুধরে দিয়েছে। কিন্তু আইএফএবির পরবর্তী ব্যাখ্যা বলছে, প্রচলিত প্রটোকলে ভিএআর মূল ঘটনাটিকে ফাউল থেকে ডাইভিংয়ে বদলে দিতে পারত না। বিশ্বকাপের শুরুতে এই সীমা স্পষ্টভাবে রক্ষা করা হলে হয়তো এমবোলোর মতো টুর্নামেন্ট বদলে দেওয়া সিদ্ধান্ত ঘটত না।
শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে মিসর ১-০ গোলে এগিয়ে থাকা অবস্থায় মোস্তফা জিকো বল জালে পাঠান। কিন্তু গোলের প্রায় ১৭ সেকেন্ড আগে এবং ঘটনাস্থল থেকে ৮০ মিটারের বেশি দূরে মারওয়ান আতিয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ে পা রেখেছিলেন বলে ভিএআর রেফারিকে পর্যালোচনার পরামর্শ দেয়। গোলটি বাতিল করা হয়। পরে মিসর ২-০ ব্যবধানে এগিয়েও ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নেয়।
এখানে সিদ্ধান্তটি আইনের সরাসরি লঙ্ঘন বলে ঘোষিত হয়নি। ফিফার নিয়মে গোলের আগে আক্রমণাত্মক পর্ব কতক্ষণ কিংবা কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে, তার নির্দিষ্ট সীমা নেই। ফলে কেউ বলেছেন, বলের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকায় ঘটনাটি একই আক্রমণের অংশ। আবার সাবেক রেফারি মার্ক ক্ল্যাটেনবার্গের মতো বিশ্লেষকের মতে, সময় ও দূরত্ব এত বেশি ছিল যে আগের ঘটনাটির সঙ্গে গোলের সরাসরি সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছিল।
বিতর্ক আরও বাড়ে ম্যাচের শেষ দিকে মোহাম্মদ সালাহ বক্সে পড়ে যাওয়ার পর মিসরের পেনাল্টির আবেদন ভিএআর মনিটর পর্যন্ত না যাওয়ায়। ফিফা বলেছে, হুলিয়ান আলভারেজ আগে বলে পা লাগিয়েছিলেন এবং পরের সংস্পর্শটি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু এক ঘটনায় বহু দূরের পুরোনো ফুটেজ খুঁজে গোল বাতিল করা আর অন্য ঘটনায় মাঠের কাছাকাছি সংঘর্ষকে সংক্ষিপ্ত পরীক্ষাতেই শেষ করার পার্থক্য মিসরীয়দের মনে বৈষম্যের প্রশ্ন তুলেছে। দেশটির ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানায়। অবশ্য ফিফার রেফারিং প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা পক্ষপাতের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, কর্মকর্তারা স্বাধীনভাবে কাজ করেছেন।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়ের তর্বিয়র্ন হেগেমের গোলও ভিএআরে বাতিল হয়। কর্নার থেকে বল মাঠে প্রবেশের আগে এরলিং হালান্ড ইংল্যান্ডের এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ধাক্কা দিয়েছিলেন। বল তখনও খেলার মধ্যে না থাকলেও কর্মকর্তারা মনে করেন, ঘটনাটি পরবর্তী গোলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। গোল বাতিল করে আবার কর্নার নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। অতিরিক্ত সময়ে নরওয়ে ২-১ গোলে হেরে যায়।
বিশ্বকাপের জন্য দেওয়া ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, বল মাঠে আসার আগের কোনো অপরাধ গোলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেললে তা পর্যালোচনা করা যাবে। সে হিসাবে সিদ্ধান্তটির আইনি ভিত্তি রয়েছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়, বক্সের ভেতর প্রায় প্রতিটি কর্নারের আগে যে ধাক্কাধাক্কি দেখা যায়, তার কতটুকু অপরাধ এবং কোনটি স্বাভাবিক জায়গা দখলের লড়াই? একই ধরনের ঘটনায় এক ম্যাচে গোল বাতিল হলে অন্য ম্যাচেও একই মানদণ্ড প্রয়োজন। এই ধারাবাহিকতার অভাবই অবিচারের ধারণা তৈরি করে।
রেফারিংয়ের চেয়েও বড় বিতর্ক তৈরি হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনকে ঘিরে। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে লাল কার্ড পাওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী তাঁর এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানোর পর ফিফা সেই নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা এক বছরের জন্য স্থগিত করে। ফলে বালোগুন বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলতে পারেন।
ফিফা বলেছে, লাল কার্ড বাতিল করা হয়নি; শৃঙ্খলাবিধির ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে শুধু শাস্তি স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু অন্য কোনো দেশের খেলোয়াড় এমন সুবিধা পাননি। বেলজিয়াম প্রতিবাদ জানায়, উয়েফা ঘটনাটিকে ফিফার ‘সীমা অতিক্রম’ হিসেবে দেখে এবং নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশনও বিষয়টি নিয়ে নৈতিক অভিযোগ করার কথা বিবেচনা করছে। প্রশ্নটি তাই শুধু একটি লাল কার্ডের ছিল না। প্রশ্ন ছিল, একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ফোন কি বিশ্বকাপের শৃঙ্খলা প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে?
মাঠের বাইরেও ন্যায়সংগত আয়োজনের প্রতিশ্রুতি প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশ্বকাপে দায়িত্ব পালনের জন্য নির্বাচিত এবং বৈধ ভিসা থাকার পরও সোমালিয়ার রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। এর ফলে বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনাকারী প্রথম সোমালি রেফারি হওয়ার ঐতিহাসিক সুযোগ হারান আফ্রিকার অন্যতম সেরা এই কর্মকর্তা।
ইরানের অভিজ্ঞতা ছিল আরও বেদনাদায়ক। যুদ্ধের অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক বৈরিতার মধ্যেই দেশটির খেলোয়াড়েরা বিশ্বকাপে অংশ নিতে এসেছিলেন। শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়েরা যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেলেও দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মী প্রবেশের অনুমতি পাননি। নিরাপত্তা বিধিনিষেধের কারণে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের বদলে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় বেস ক্যাম্প স্থাপন করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ খেলতে সীমান্ত পেরিয়ে যাতায়াত, অভিবাসন পরীক্ষা এবং দ্রুত ফিরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা তাদের প্রস্তুতি, বিশ্রাম ও মানসিক স্থিরতার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
শেষ কথা হলো, প্রযুক্তি যত আধুনিকই হোক, শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন মানুষ। তাই সেই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নিয়ম, ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের মানদণ্ড সবার জন্য এক হওয়া উচিত। ফুটবল মানুষকে হার মেনে নিতে শেখায়, কিন্তু অবিচার মেনে নিতে নয়। কারণ একটি দল ম্যাচ হারলে চার বছর পর আবার চেষ্টা করতে পারে; অথচ ভুল সিদ্ধান্তে হারিয়ে যাওয়া একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত কখনও আর ফিরে আসে না।
এনএন/ ৩০ জুলাই ২০২৬









