
একসময় ঢাকার সন্ধ্যা মানেই ছিল হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়া। বিরক্তির সেই মুহূর্তে অনেকেই হাতপাখা নিয়ে বসতেন, কেউবা গল্পে মেতে উঠতেন। কিন্তু একটি ছোট্ট মেয়ে তখন অন্য কিছু করত। ঘরের বাইরে এসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। শহরের আলো নিভে গেলে আকাশজুড়ে ফুটে উঠত অসংখ্য তারা। সেই তারার ভিড়ের মাঝেই তাঁর মনে জন্ম নিয়েছিল একটি প্রশ্ন। মহাবিশ্বের ওপারে কী আছে? পাঁচ বছর বয়সে মায়ের মুখে মঙ্গল গ্রহে নাসার পাথফাইন্ডার মহাকাশযানের গল্পও তাঁর কল্পনার জগৎকে আরও বিস্তৃত করে দেয়। সেই কৌতূহলই বছরের পর বছর তাঁকে পথ দেখিয়েছে। আজ সেই মেয়েটিই বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান সাময়িকী Scientific American-এর Future of Science প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছেন। তিনি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী তনিমা তাসনিম অনন্যা।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অঙ্গনে এমন স্বীকৃতি কেবল তনিমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি বাংলাদেশ এবং সারা বিশ্বের বাংলাভাষীদের জন্যও গর্বের বিষয়। মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তুগুলোর একটি অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর বা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল নিয়ে তাঁর গবেষণা বিজ্ঞানীদের মধ্যে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।
কৃষ্ণগহ্বরের নাম শুনলেই অনেকের মনে হয়, এটি সবকিছু গিলে ফেলা এক রহস্যময় অন্ধকার। বাস্তবে বিষয়টি আরও বিস্ময়কর। অধিকাংশ বড় ছায়াপথের কেন্দ্রেই রয়েছে অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর। এগুলোকে সরাসরি দেখা যায় না, কারণ এদের মহাকর্ষ এত শক্তিশালী যে আলো পর্যন্ত সেখান থেকে বের হতে পারে না।
তাহলে বিজ্ঞানীরা কৃষ্ণগহ্বর সম্পর্কে জানেন কীভাবে? তনিমা ও তাঁর গবেষণা দল সেই উত্তরই খুঁজছেন। তাঁরা বিভিন্ন ধরনের দূরবীক্ষণ যন্ত্রে পাওয়া আলোর তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করেন। সেই তথ্য থেকে বোঝার চেষ্টা করেন, কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে কী ঘটছে এবং তা আশপাশের ছায়াপথকে কীভাবে প্রভাবিত করছে।
তনিমার গবেষণা শুধু কৃষ্ণগহ্বরের আচরণ বোঝার জন্য নয়। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পারেন, একটি ছায়াপথ কীভাবে গড়ে ওঠে, কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং সময়ের সঙ্গে তার ভবিষ্যৎ কোন দিকে এগোয়। তাই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে তাঁর কাজ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
এই গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবেই Scientific American তাঁকে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় বিজ্ঞানীদের একজন হিসেবে তুলে ধরেছে। বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই বিজ্ঞান সাময়িকী এমন গবেষকদের সামনে নিয়ে আসে, যাঁদের কাজ ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ শিক্ষাজীবন ও নিরলস গবেষণা। যুক্তরাষ্ট্রের Bryn Mawr College থেকে পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে স্নাতক শেষ করার পর তিনি Yale University থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। পরে Dartmouth College এ গবেষণার মাধ্যমে নিজের কাজকে আরও সমৃদ্ধ করেন। বর্তমানে তিনি Wayne State University তে গবেষণা ও শিক্ষকতা করছেন।
তনিমা ছোটবেলা থেকেই নিজেকে একজন বিজ্ঞানী হিসেবে কল্পনা করতেন। তখন বিজ্ঞানীর কাজ ঠিক কী, তা তাঁর জানা ছিল না। তবু তিনি জানতেন, বড় হয়ে তিনি বিজ্ঞান নিয়েই কাজ করতে চান। সেই শিশুসুলভ স্বপ্নই সময়ের সঙ্গে পরিণত হয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত গবেষণায়।
গবেষণার পাশাপাশি তনিমা তরুণ শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করতেও কাজ করেন। তাঁর বিশ্বাস, বড় কোনো আবিষ্কারের শুরু হতে পারে একটি সাধারণ প্রশ্ন থেকে। সেই প্রশ্ন করার সাহসই একজন গবেষককে এগিয়ে নেয়। তাঁর অভিজ্ঞতায়, সব সময় প্রথম চেষ্টাতেই সফল হওয়া যায় না। নতুন কিছু শিখতে হলে ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আবার চেষ্টা করতে হয়।
তনিমার গল্পের বিশেষ তাৎপর্য হচ্ছে, বাংলাদেশে বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সীমিত হলেও কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং উপযুক্ত শিক্ষা একজন মানুষকে কত দূর নিয়ে যেতে পারে, তাঁর জীবন তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি মনে করেন, তরুণরা যদি প্রচলিত পথের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো বিষয়ে কাজ করতে চায়, তবে পরিবার ও সমাজের উচিত তাদের উৎসাহ দেওয়া।
আজকের শিশুরা যখন রাতের আকাশে একটি উজ্জ্বল তারা দেখে বিস্মিত হয়, তখন হয়তো তাদের কেউই জানে না, সেই আকাশের রহস্য উদ্ঘাটনে কাজ করছেন একজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী। তনিমা তাসনিম অনন্যার সাফল্য শুধু গবেষণাগারের নয়; এটি নতুন প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগানোরও গল্প।









