
অন্টারিও সরকারের পর্যটনমন্ত্রী স্ট্যান চো মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন। কুইন্স পার্ক থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে নিজের বাড়ি থাকা সত্ত্বেও গত তিন বছরে তিনি টরন্টোর হোটেলে থাকার জন্য ১৬ হাজার ডলারের বেশি খরচ দাবি করেছিলেন। বিষয়টি প্রকাশের পর পুরো অর্থ ফেরত দিয়ে শুক্রবার মন্ত্রিসভা ছাড়েন তিনি। তাঁর বিদায়ের পর ক্ষমতাসীন দলের আরও এমপিপির হোটেল খরচ, ২ কোটি ৮৯ লাখ ডলার দিয়ে সরকারের জন্য ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ কেনা, অন্টারিও প্লেস পুনর্নির্মাণের বিপুল ব্যয় এবং সরকারের আরও কয়েকটি ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট, চিকিৎসকের অভাব এবং পরিবারের দৈনন্দিন খরচ সামলাতে হিমশিম খাওয়া অন্টারিওবাসীর কাছে এসব ঘটনা এখন শুধু সরকারি ব্যয়ের হিসাব নয়। এগুলো সাধারণ মানুষের বাস্তবতার সঙ্গে সরকারের অগ্রাধিকারের ক্রমবর্ধমান দূরত্বের প্রতীক হয়ে উঠছে। প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডও স্ট্যানের হোটেল খরচকে “সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য” বলেছেন।
স্ট্যান বলেছেন, আইনসভার অধিবেশন দেরিতে শেষ হওয়া রাতগুলোতেই তিনি হোটেলে থেকেছেন এবং তাঁর দাবিগুলো প্রচলিত বিধিমালার মধ্যে ছিল। কিন্তু তিনি একই সঙ্গে ভুল স্বীকার করে বলেছেন, বিষয়টি সাধারণ মানুষের চোখে কেমন দেখাবে, তা তিনি বিবেচনা করেননি। সেখানেই এ বিতর্কের আসল রাজনৈতিক তাৎপর্য। কোনো ব্যয় বিধিমালার মধ্যে অনুমোদিত হলেই সেটি জনসমর্থিত বা নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে যায় না। তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেও উইলোডেলের এমপিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাবেন।
এনডিপি নেতা ম্যারিট স্টাইলস বলেছেন, স্ট্যানের পদত্যাগ তাঁর হোটেল ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে না। তাঁর হিসাবে, টরন্টো ও আশপাশের এলাকার ২০ জন বর্তমান ও সাবেক পিসি মন্ত্রী ও এমপিপি গত তিন বছরে হোটেল খরচ হিসেবে মোট ১ লাখ ২১ হাজার ৪০৯ ডলার দাবি করেছেন। তাঁদের মধ্যে হারদীপ গ্রেওয়াল ২৭ হাজার ২৭৫ ডলার, নিনা ট্যাংরি ১৮ হাজার ৯৭৬ ডলার এবং শারমেইন উইলিয়ামস ১৫ হাজার ৮৬৫ ডলার দাবি করেন। সমালোচনার মুখে ফোর্ড বলেছেন, বর্তমান মন্ত্রী ও এমপিপিদের প্রত্যেককে এসব খরচের প্রতিটি পয়সা ফেরত দিতে হবে।
অন্তর্বর্তীকালীন লিবারেল নেতা জন ফ্রেজার বলেছেন, স্ট্যান চোর পদত্যাগে ঘটনার শেষ হয়নি। তাঁর মতে, স্ট্যানের হোটেল ব্যয় বৃহত্তর সমস্যার একটি উদাহরণ মাত্র। জনগণের অর্থ ব্যবহারে সুবিধাভোগী মানসিকতা সরকারের ওপরের স্তর থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। কারা কখন, কোথায় এবং কেন হোটেলে ছিলেন, তার রসিদসহ পূর্ণ হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
ফ্রেজার এ প্রসঙ্গে ফোর্ড সরকারের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ কেনার ঘটনাও সামনে এনেছেন। অন্টারিও সরকার প্রায় ২ কোটি ৮৯ লাখ ডলার দিয়ে ব্যবহৃত একটি বোম্বার্ডিয়ার চ্যালেঞ্জার ৬৫০ উড়োজাহাজ কিনেছিল। খবর প্রকাশের পর তীব্র জনসমালোচনার মুখে সেটি কেনা দামেই বোম্বার্ডিয়ারের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ক্রয় ও পুনর্বিক্রয়ের মূল্যে সরাসরি ক্ষতি হয়নি বলে সরকার দাবি করলেও প্রকাশিত নথিতে উড়োজাহাজটি ঘিরে আরও ১ লাখ ৯০ হাজার ৮৬৫ ডলার ব্যয়ের তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে উড়োজাহাজটি কেনার প্রয়োজনীয়তা, সিদ্ধান্তটি আগে জনসমক্ষে না আনা এবং সরকারের প্রশাসনিক বিচারবোধ নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে।
ফোর্ড সরকারের ব্যয় নিয়ে বিরোধীদের সমালোচনা এখন আইনসভা ও সংবাদ সম্মেলন ছাড়িয়ে রাজপথেও পৌঁছেছে। অন্টারিও লিবারেল পার্টির অফিসিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ছবিতে স্কারবরোতে ফোর্ডবিরোধী বার্তাসংবলিত ডিজিটাল বিলবোর্ড ট্রাক দেখা গেছে। এর এক পাশে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সরকারের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তকে পাশাপাশি তুলে ধরা হয়। অন্য পাশে লেখা ছিল, “ডাগ ফোর্ড স্কারবরোর মানুষের কথা ভাবেন না।”
অন্টারিও প্লেস পুনর্নির্মাণ প্রকল্প ঘিরেও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। প্রাদেশিক অডিটর জেনারেলের হিসাবে, ২০১৯ সালে যে প্রকল্পে ৩৩ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৪২ কোটি ৪০ লাখ ডলার সরকারি ব্যয়ের ধারণা করা হয়েছিল, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেই হিসাব বেড়ে প্রায় ২২৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারে পৌঁছায়। অডিটর জেনারেল বলেছেন, প্রকল্পের প্রস্তাব বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ বা জবাবদিহিমূলক ছিল না।
অন্টারিও সরকারের নাগরিক সেবাকেন্দ্র সার্ভিসঅন্টারিওর নয়টি কেন্দ্র অফিসসামগ্রীর খুচরা দোকান স্ট্যাপলসে স্থানান্তর ও পরিচালনায় ২০২৭ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ ডলার ব্যয় হবে বলে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস হিসাব করেছে। এ ব্যয় সরকারের প্রাথমিক হিসাবের চেয়েও বেশি। চুক্তি প্রদান, সেবা কেন্দ্রের সংখ্যা এবং সরকারি সেবা বেসরকারি দোকানে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এসব ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক অন্টারিওবাসী লিখছেন, ফোর্ড সরকার জনগণের মনোভাব বোঝে না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মন্তব্যকে বৈজ্ঞানিক জনমত জরিপ বলা যায় না। তবে সেখানে প্রকাশিত ক্ষোভের সঙ্গে সাম্প্রতিক জরিপের ফলাফলের উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।
জনমত গবেষণা প্রতিষ্ঠান লেজারের মে মাসের জরিপে ৫৬ শতাংশ অন্টারিওবাসী বলেছেন, প্রদেশ ভুল পথে এগোচ্ছে। অন্যদিকে নির্দলীয় জনমত গবেষণা সংস্থা অ্যাঙ্গাস রিড ইনস্টিটিউটের জরিপে ৮১ শতাংশ মানুষ জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, ৭৯ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা এবং ৮৩ শতাংশ সাশ্রয়ী আবাসনের ক্ষেত্রে সরকারের কাজকে দুর্বল বলেছেন।
মানুষের ক্ষোভের পেছনে বাস্তব সামাজিক সংকট রয়েছে। টরন্টো ও আশপাশের বহু এলাকায় স্বল্প আয়ের পরিবার, নতুন অভিবাসী, সিঙ্গেল পেরেন্ট, প্রবীণ এবং সামাজিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল মানুষ বসবাস করেন। খাদ্য, বাসাভাড়া, যাতায়াত এবং শিশুদের বিভিন্ন কার্যক্রমের খরচ বাড়ায় এসব পরিবারের ওপর চাপ বেড়েছে।
অন্টারিওতে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২০২৪ সালের প্রায় ৩০ লাখ থেকে ২০৫১ সালে ৪৬ লাখে পৌঁছাতে পারে। ফলে চিকিৎসা, হোম কেয়ার, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা এবং সামাজিক সহায়তার চাহিদা দ্রুত বাড়বে। তবে জনসংখ্যার বয়স বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং সেবার বাড়তি চাহিদার সঙ্গে সরকারি বিনিয়োগ তাল মিলিয়ে চলছে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
স্কুলশিক্ষায় অর্থায়নের চাপও স্পষ্ট। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিসের হিসাবে, মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় ২০২৪-২৫ সালে শিক্ষার্থীপ্রতি পরিচালন বরাদ্দ গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সরকারের বর্তমান ব্যয় পরিকল্পনা অপরিবর্তিত থাকলে ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে এ অবস্থার আরও অবনতি হতে পারে।
উচ্চশিক্ষায় সমস্যাটি আরও গভীর। ২০২২-২৩ সালে দেশীয় পূর্ণকালীন সমমানের শিক্ষার্থীপ্রতি সরকারি সহায়তায় অন্টারিওর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কানাডার সব প্রদেশের পেছনে ছিল। পরে নতুন অর্থায়ন ঘোষণা করা হলেও ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির তুলনায় তা যথেষ্ট কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে। অর্থের ঘাটতি দীর্ঘ হলে কোর্স, শিক্ষক, শিক্ষার্থী সহায়তা এবং সামগ্রিক শিক্ষার মানে এর প্রভাব পড়তে পারে।
স্ট্যান চোর পদত্যাগে মন্ত্রিসভা একজন সদস্য হারিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে আরও বড় ক্ষতি হয়েছে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতায়। একের পর এক বিতর্কের পর মানুষের মনে প্রশ্ন উঠেছে, অগ্রাধিকার কি সাধারণ মানুষের প্রয়োজন, নাকি দলীয় সুবিধা ও ব্যয়বহুল প্রকল্প? এর উত্তর এখন আর শুধু সরকারি বক্তব্যে নির্ধারিত হবে না; আসন্ন নির্বাচনগুলোতে অন্টারিওবাসীর ভোটই দেবে চূড়ান্ত রায়।
তথ্যসূত্র:
Toronto Star (July 17, 2026)
Global News (July 17, 2026)









