সম্পাদকের পাতা

দাবানলের ধোঁয়ায় বিপর্যস্ত টরন্টো, বিষাক্ত বাতাসে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি

নজরুল মিন্টো

উত্তর-পশ্চিম অন্টারিওর শত শত দাবানল থেকে উঠে আসা ঘন ধোঁয়া দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কানাডার বৃহত্তম নগরীকে ঢেকে ফেলেছে। বুধবার সকালে শহরের ওপর নেমে আসে হলুদ ও কমলা ধোঁয়ার এমন এক আবরণ, যার ভেতর সিএন টাওয়ার, লেক অন্টারিওর জলরেখা এবং বহুতল ভবনগুলোকে মনে হচ্ছিল দূরের অস্পষ্ট ছায়া। বাতাসে পোড়া গন্ধ, চোখে জ্বালা, গলায় অস্বস্তি এবং নিঃশ্বাসে ভার অনুভব করে অনেকে ঘুম থেকে উঠেছেন। উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে পরিবার থেকে পরিবারে। মানুষ ফোন করে সন্তান, প্রবীণ মা-বাবা, বন্ধু ও একা বসবাসকারী স্বজনদের খোঁজ নিচ্ছেন। জানালা বন্ধ রাখা, প্রয়োজনীয় ওষুধ কাছে রাখা এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন একে অন্যকে।

পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তার প্রমাণ মিলেছে সরকারি বায়ুমান সূচকে। এনভায়রনমেন্ট কানাডা টরন্টোর এয়ার কোয়ালিটি হেলথ ইনডেক্স ১০ প্লাস, অর্থাৎ ‘অত্যন্ত উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকি’ হিসেবে দেখিয়েছে। একপর্যায়ে বিশ্বের প্রধান শহরগুলোর মধ্যে বায়ুমানের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে উঠে আসে টরন্টো। হেলথ কানাডা নগরীর বাসিন্দাদের বাইরে থাকার সময় কমাতে, পরিশ্রমসাধ্য কাজ এড়িয়ে চলতে, ঘরের দরজা-জানালা যতটা সম্ভব বন্ধ রাখতে এবং প্রয়োজনে পরিষ্কার বাতাস রয়েছে এমন ইনডোর স্থানে থাকতে বলেছে।

ধোঁয়ার সতর্কতায় টরন্টোর বাইরের বহু আয়োজন থেমে গেছে। ফিফা ফ্যান ফেস্টিভ্যাল, নাথান ফিলিপস স্কয়ারের বিশ্বকাপ ওয়াচ পার্টি এবং ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর খেলা দেখার অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। সিটি কর্তৃপক্ষ বুধবারের বাকি সময়ের জন্য সব আউটডোর ও ওয়েডিং পুলও বন্ধ করে দেয়।

দাবানলের ধোঁয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য কতটা বিপজ্জনক, ২০২৩ সালের অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ। সে বছর অন্টারিওতে ভারী ধোঁয়ার প্রথম ঢেউয়ের পর অ্যাজমাজনিত সমস্যায় জরুরি বিভাগে আসা রোগীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছিল। শিশুদের মধ্যে রোগী সাময়িকভাবে ৪০ শতাংশ এবং প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছিল। প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর এর প্রভাব এক সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল।

এবার দাবানলের ধোঁয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রচণ্ড গরম। মঙ্গলবার শহরের তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে ১৪ জুলাইয়ের আগের রেকর্ড ভেঙে দেয়। পুরোনো রেকর্ডটি ছিল ১৯৯৫ সালের ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি। বুধবার ঘন ধোঁয়ায় সূর্যের আলো বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দুপুরের শুরুতেই তাপমাত্রা হঠাৎ ২৫ ডিগ্রিতে নেমে আসে। তাপ সতর্কতা তুলে নেওয়া হলেও কমলা পর্যায়ের বায়ুমান সতর্কতা বহাল রয়েছে। টরন্টো ২০২৩ সালের জুনেও দাবানলের ঘন ধোঁয়ায় ঢাকা পড়েছিল, তবে এবারের পরিস্থিতি রেকর্ড ভাঙা তাপমাত্রার কারণে আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

এই সংকটের উৎস উত্তর অন্টারিও। মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ১৪৮টি দাবানল সক্রিয় ছিল, যার ৬৯টি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আরও ৩৭টি আগুনের মধ্যে পাঁচটি নিয়ন্ত্রণে ছিল না। আর্মস্ট্রংসহ একাধিক ফার্স্ট নেশন কমিউনিটি থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের বহু পরিবার রাতের অন্ধকারে ঘর ছেড়েছে এবং কলিন্স ফার্স্ট নেশনে ব্যাপক ধ্বংসের খবর এসেছে। বুধবার দেশজুড়ে ৮৩৫টি দাবানল সক্রিয় ছিল, যার ১১২টি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। চলতি মৌসুমে ইতিমধ্যে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে।

কানাডার প্রায় অর্ধেক দাবানল বজ্রপাত থেকে শুরু হয়। বাকি আগুনের পেছনে থাকে মানুষের কর্মকাণ্ড, যেমন অসতর্ক ক্যাম্পফায়ার, যানবাহন, যন্ত্রপাতি কিংবা বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। শুকনো বন, টানা গরম, কম আর্দ্রতা ও প্রবল বাতাস ছোট আগুনকেও অল্প সময়ের মধ্যে ভয়ংকর করে তুলতে পারে।

আকাশের কমলা রং অস্বাভাবিক মনে হলেও এটি গুরুতর বায়ুদূষণের সতর্কসংকেত। দাবানলের ধোঁয়ার অতি সূক্ষ্ম কণা ফুসফুসের গভীরে পৌঁছে শ্বাসকষ্ট, কাশি, চোখ ও গলায় জ্বালা এবং বুকে অস্বস্তি সৃষ্টি করতে পারে। শিশু, প্রবীণ, গর্ভবতী নারী এবং হাঁপানি, হৃদ্‌রোগ বা ফুসফুসের সমস্যায় আক্রান্তদের ঝুঁকি আরও বেশি। তবে সুস্থ মানুষও এই ধোঁয়ার ক্ষতি থেকে নিরাপদ নন।

তাই প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়া, বাইরের খেলাধুলা ও পরিশ্রমসাধ্য কাজ এড়িয়ে চলা, জানালা-দরজা বন্ধ রাখা এবং ঘরের বাতাস যতটা সম্ভব পরিষ্কার রাখাই এখন সবচেয়ে জরুরি। একান্ত বাইরে যেতে হলে মুখের সঙ্গে ভালোভাবে আঁটসাঁট মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। গুরুতর শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা কিংবা অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে চিকিৎসা নিতে হবে।

এই সতর্কতাগুলো শুধু ব্যক্তিগত সুরক্ষার পরামর্শ নয়; দূরের একটি আগুন কীভাবে পুরো নগরজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে, সেটিও মনে করিয়ে দেয়। আগুন যেখানে জ্বলে, বিপদ কেবল সেখানেই আটকে থাকে না। একটি বনের ধোঁয়া শত শত কিলোমিটার পেরিয়ে শহরের আকাশ ঢেকে দেয়, খেলার মাঠ খালি করে, উৎসব থামিয়ে দেয় এবং সুস্থ মানুষের ফুসফুসেও পৌঁছে যায়। বাতাসের দিক বদলালে টরন্টোর আকাশ ধীরে ধীরে পরিষ্কার হতে পারে বলে আবহাওয়াবিদেরা পূর্বাভাস দিয়েছেন।

তথ্যসূত্র:
Toronto Star (July 15, 2026)
Environment and Climate Change Canada (July 15, 2026)
Reuters (July 15, 2026)
The Canadian Press (July 15, 2026)


Back to top button
🌐 Read in Your Language