
বিশ্বকাপের মাঠে একটি লাল কার্ড কখনও কখনও শুধু একটি সিদ্ধান্ত নয়; সেটি হয়ে উঠতে পারে ন্যায়বিচার, ক্ষমতা ও প্রভাবের পরীক্ষা। ফুটবলপ্রেমীরা বিশ্বাস করতে চান, মাঠে শেষ কথা বলেন রেফারি, নিয়মের শেষ ব্যাখ্যা দেয় আইন, আর জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে খেলোয়াড়দের পা। কিন্তু সেই বিশ্বাসে যদি হঠাৎ ঢুকে পড়ে রাষ্ট্রক্ষমতার ফোনকল, যদি একটি লাল কার্ডের ভাগ্য নিয়ে কথা বলেন পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: বিশ্বকাপ কি এখনও শুধু ফুটবলের?
২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এমনই এক বিতর্ক। বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২ ম্যাচে সরাসরি লাল কার্ড দেখেছিলেন বালোগুন। সাধারণ নিয়মে এর অর্থ ছিল, বেলজিয়ামের বিপক্ষে পরের ম্যাচে তাঁর খেলা হবে না। কিন্তু ম্যাচের আগের দিন ফিফা জানায়, বালোগুনের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা আপাতত কার্যকর করা হচ্ছে না। শাস্তিটি এক বছরের পরীক্ষাকালীন ভিত্তিতে স্থগিত রাখা হয়েছে। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলতে তাঁর আর বাধা নেই। তবে এক বছরের মধ্যে একই ধরনের গুরুতর অপরাধ করলে এই স্থগিত শাস্তি আবার কার্যকর হবে।
ঘটনাটি এখানেই শেষ হলে হয়তো এটি ফুটবলের নিয়মের ব্যাখ্যা নিয়ে একটি সাধারণ বিতর্ক থাকত। কিন্তু বিষয়টি অন্য মাত্রা পায় যখন জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে বালোগুনের লাল কার্ডের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেছিলেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ট্রাম্প সরাসরি ইনফান্তিনোর সঙ্গে কথা বলেন; পরে ফিফা বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে।
এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ বেলজিয়াম। রয়্যাল বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, তারা ফিফার সিদ্ধান্তে “বিস্মিত”। তাদের যুক্তি, ফিফার শৃঙ্খলা বিধির ৬৬.৪ ধারা এবং বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা বিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় সরাসরি লাল কার্ডের পর স্বয়ংক্রিয় এক ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার কথা বলা আছে। তাই ফিফা একই সঙ্গে একদিকে স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞার নিয়ম রাখছে, অন্যদিকে আরেক ধারার ব্যাখ্যায় সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করছে।
বেলজিয়ামের কোচ রুডি গার্সিয়া এই সিদ্ধান্তকে শুধু একটি ম্যাচের বিষয় হিসেবে দেখছেন না। তাঁর মতে, এখানে ফুটবলের নৈতিকতা ও প্রতিযোগিতার সমতার প্রশ্ন জড়িত। বেলজিয়াম সম্ভাব্য সব পথ খতিয়ে দেখছে। নরওয়ের কোচ স্টালে সোলবাকেনও ফিফার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন, এমন সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে এবং ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। ইউএস সকার বলেছে, তারা ফিফার শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত মেনে নিচ্ছে এবং বালোগুন খেলতে পারবেন জেনে সন্তুষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল, বালোগুনের ট্যাকলটি ইচ্ছাকৃত বা সহিংস ছিল না। তাই সরাসরি লাল কার্ড দেখানো অতিরিক্ত কঠোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে মনে করেন দলের অনেক খেলোয়াড়। অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিকও বলেন, তিনি ঘটনাটিতে ইচ্ছাকৃত আঘাতের কোনো প্রমাণ দেখেননি।
কিন্তু এই বিতর্কের আসল কেন্দ্র বালোগুন নন। আসল প্রশ্ন হলো, একই পরিস্থিতিতে যদি কোনো ছোট দেশের ফুটবলার থাকতেন, তাঁর ক্ষেত্রেও কি এমন দ্রুত পুনর্বিবেচনা হতো? কোনো আফ্রিকান, এশিয়ান কিংবা ছোট দ্বীপদেশের রাষ্ট্রপ্রধান ফিফা প্রেসিডেন্টকে ফোন করলে কি একই প্রতিক্রিয়া পাওয়া যেত? নাকি বিশ্ব ফুটবলের ভেতরেও অদৃশ্যভাবে কাজ করে বিশ্বরাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য?
বিশ্বকাপ সবসময়ই শুধু খেলা ছিল না। ১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপে মুসোলিনির রাজনৈতিক ছায়া ছিল। ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছিল সামরিক শাসনের সময়, যেখানে ফুটবল আনন্দের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছিল। বিশ্বকাপের ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, মাঠের বাইরে রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও প্রভাবের আরেকটি অদৃশ্য খেলা চলে।
২০২৬ বিশ্বকাপের এই ঘটনাটি তাই নতুন নয়, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে বিতর্কটি সরাসরি একটি ম্যাচের সিদ্ধান্ত, একটি লাল কার্ড, একটি খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণ এবং একটি রাষ্ট্রপ্রধানের হস্তক্ষেপকে এক সুতোয় বেঁধে দিয়েছে। বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। সেই দেশের প্রেসিডেন্ট নিজ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলারের শাস্তি নিয়ে ফিফা সভাপতির সঙ্গে কথা বলেছেন। এর পরপরই ফিফা এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা প্রতিপক্ষ দলকে বিস্মিত করেছে।
ফিফা নিশ্চয়ই বলবে, তারা নিয়ম মেনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু ফুটবলে শুধু নিয়ম থাকলেই হয় না; নিয়মের প্রয়োগেও সমতা থাকতে হয়। একই অপরাধে এক খেলোয়াড় নিষিদ্ধ হবে, আর আরেক খেলোয়াড় রাজনৈতিক আলোচনার পর খেলতে পারবে, এমন ধারণা তৈরি হলে সেটি বিশ্বাসকে আঘাত করে।
বিশ্বকাপের সৌন্দর্য এখানেই যে, এখানে ছোট দেশও বড় দেশকে হারাতে পারে। এখানে জনসংখ্যা, সামরিক শক্তি বা কূটনৈতিক প্রভাব নয়, শেষ কথা বলার কথা মাঠের ফুটবল। কিন্তু মাঠের বাইরের প্রভাব যদি মাঠের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে শুরু করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: খেলাটি কি সত্যিই সবার জন্য সমান?
বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় স্বস্তি। তিনি এই বিশ্বকাপে তিন গোল করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। বেলজিয়ামের বিপক্ষে তাঁর উপস্থিতি নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু একই সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত বেলজিয়ামের কাছে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য নষ্টের অভিযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালেও ট্রাম্পের উপস্থিতির কথা আলোচনায় আছে। এমন অবস্থায় বালোগুনের বিষয়ে ফিফার সিদ্ধান্তকে একেবারে সাধারণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখানো কঠিন। কারণ মানুষ শুধু সিদ্ধান্ত দেখে না, সিদ্ধান্তের পেছনের প্রেক্ষাপটও দেখে। যদি কোনো সিদ্ধান্তের আগে ক্ষমতাধর কারও ফোনকলের খবর আসে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, সিদ্ধান্তটি কি শুধু নিয়ম মেনে হয়েছে, নাকি প্রভাবও কাজ করেছে?
এই বিতর্কের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। যদি আজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফোন করেন, কাল অন্য কোনো শক্তিধর দেশের রাষ্ট্রপ্রধানও একই পথ নিতে চাইবেন। তখন ফিফা কি প্রত্যেককে একই সুযোগ দেবে? নাকি কেবল ক্ষমতাধরদের কথাই বেশি শোনা হবে?
বিশ্বকাপের মাঠে রেফারির বাঁশি, ভিএআরের পর্যালোচনা, শৃঙ্খলা কমিটির সিদ্ধান্ত—সবই খেলার অংশ। কিন্তু রাষ্ট্রক্ষমতার ফোনকল খেলার অংশ নয়। খেলোয়াড় ভুল করতে পারেন, রেফারি ভুল করতে পারেন, ফিফাও সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারে। কিন্তু সেই পুনর্বিবেচনার পথ যদি রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়ায় ঢাকা পড়ে, তাহলে বিশ্বকাপের নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
ফোলারিন বালোগুন বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলবেন, গোলও করতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্র জিততেও পারে। কিন্তু ম্যাচের ফল যাই হোক, ইতিহাসে থেকে যাবে অন্য প্রশ্নটি: বিশ্বকাপের এক লাল কার্ড কি ফুটবলের নিয়মে বদলেছিল, নাকি বিশ্ব মোড়লের ফোনে?
তথ্যসূত্র:
Reuters, ৫ জুলাই ২০২৬
Associated Press, ৫ জুলাই ২০২৬
The Guardian, ৫ জুলাই ২০২৬









