
ফুটবল ম্যাচে সময় যেন সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। একটি সেকেন্ডের ভুলে গোল হয়, একটি মুহূর্তের সিদ্ধান্তে বদলে যায় ইতিহাস। সেই খেলাই হঠাৎ থেমে যায়। রেফারির বাঁশি বাজে, খেলোয়াড়েরা বল ছেড়ে সাইডলাইনের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। গ্যালারিতে কৌতূহল জাগে, টেলিভিশনের দর্শকও ভাবেন, কী ঘটল? কেউ কি আহত? না। মাঠে তখন শুরু হয়েছে আরেকটি লড়াই, মানুষের শরীরকে প্রকৃতির তীব্র দাবদাহের বিরুদ্ধে টিকিয়ে রাখার লড়াই।
এই ছোট্ট বিরতির নাম হাইড্রেশন ব্রেক। সময় মাত্র তিন মিনিট। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে এই কয়েকটি মিনিটের মূল্য কখনও কখনও একটি গোলের চেয়েও বেশি। কারণ খেলোয়াড় ক্লান্ত হলে খেলা খারাপ হয়, আর শরীর ভেঙে পড়লে খেলা থেমে যেতে পারে চিরতরের জন্য।
একসময় ফুটবল মানেই ছিল অবিরাম ছুটে চলা। মাঝপথে থামার সুযোগ ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিদ্যা এবং খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা আজ ফুটবলকে নতুন এক বাস্তবতা শিখিয়েছে। এখন বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ আসরেও কখনও কখনও খেলা থামে, যাতে মানুষটি টিকে থাকে। কারণ ফুটবলের সবচেয়ে বড় সম্পদ ট্রফি নয়, গোলও নয়; সেই গোলের পেছনে ছুটে চলা মানুষটি।
হাইড্রেশন ব্রেক বিশ্বকাপের দীর্ঘদিনের নিয়ম নয়। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে ফিফা প্রথমবার খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় এই বিরতির অনুমতি দেয়। ব্রাজিলের প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে কয়েকটি ম্যাচে এটি প্রয়োগ করা হয়। প্রথম কুলিং ব্রেকটি হয়েছিল নেদারল্যান্ডস ও মেক্সিকোর শেষ ষোলোর ম্যাচে। ফোর্তালেজার তীব্র গরমে খেলোয়াড়দের সুরক্ষাই ছিল সেই সিদ্ধান্তের মূল কারণ। এরপর ২০১৮ সালের রাশিয়া ও ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও প্রয়োজন অনুযায়ী এই বিরতি দেওয়া হয়।
তবে ২০২৬ বিশ্বকাপে এসেছে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। এবার আর আবহাওয়া দেখে নয়, টুর্নামেন্টের ১০৪টি ম্যাচের প্রতিটিতেই প্রতিটি অর্ধের ২২তম মিনিটের দিকে বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেক রাখা হয়েছে। ফিফার যুক্তি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর বিশাল ভৌগোলিক পরিসর, গ্রীষ্মের তাপমাত্রা এবং খেলোয়াড়দের শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত।
এই বিরতিতে খেলোয়াড়রা শুধু পানি পান করেন না। শরীরের হারানো পানি ও লবণের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে ইলেকট্রোলাইট গ্রহণ করেন। ফিজিওথেরাপিস্টরা দ্রুত দেখে নেন কারও মধ্যে হিট স্ট্রেস বা পানিশূন্যতার লক্ষণ আছে কি না। অনেক খেলোয়াড় বরফে ভেজানো তোয়ালে কাঁধে বা ঘাড়ে জড়িয়ে শরীরের তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা করেন। মাত্র কয়েক মিনিটের এই পরিচর্যা পরবর্তী প্রায় আধা ঘণ্টার জন্য শরীরকে নতুন শক্তি জোগায়।
অন্যদিকে কোচদের কাছে এই বিরতি যেন অঘোষিত টাইম-আউট। ফুটবলে যেখানে নির্ধারিত টাইম-আউট নেই, সেখানে এই তিন মিনিটেই পাল্টে যেতে পারে পুরো কৌশল। কোন দিক দিয়ে আক্রমণ বাড়াতে হবে, কার মার্কিং শক্ত করতে হবে কিংবা কাকে বদলি নামানো হবে, এসব গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা মুহূর্তেই পৌঁছে যায় খেলোয়াড়দের কাছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই সংক্ষিপ্ত বিরতি ম্যাচের গতিপথও বদলে দিতে পারে।
তবে এই নিয়ম নিয়ে বিতর্কও কম নয়। অনেক কোচ, খেলোয়াড় ও ফুটবল বিশ্লেষকের মতে, এতে ফুটবলের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট হয়। খেলা যেন দুই অর্ধের বদলে চার ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। সমালোচকদের মতে, এই বিরতি সম্প্রচারকারীদের অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগও তৈরি করে। যদিও ফিফা বলছে, সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার কথা ভেবেই নেওয়া হয়েছে, বাণিজ্যিক কারণে নয়।
আসলে ফুটবল এখন শুধু আবেগের খেলা নয়; এটি বিজ্ঞানেরও খেলা। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অতিরিক্ত গরমে দীর্ঘ সময় দৌড়ালে শরীর দ্রুত পানি হারায়, রক্ত ঘন হয়ে যায়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে এবং হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। তাই বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতায় একটি ছোট্ট বিরতি কখনও কখনও বড় দুর্ঘটনা এড়াতে পারে।
দর্শকের কাছে এই বিরতি হয়তো মাত্র তিন মিনিট। কিন্তু এই অল্প সময়েই একজন ফুটবলার শরীরের ক্লান্তি কিছুটা কাটিয়ে ওঠেন, কোচের নতুন পরিকল্পনা শোনেন এবং নতুন উদ্যমে ফিরে আসেন ম্যাচের লড়াইয়ে।
তাই বিশ্বকাপে হাইড্রেশন ব্রেক শুধু পানি পানের বিরতি নয়। এটি আধুনিক ফুটবলের এক মানবিক সিদ্ধান্ত, যেখানে প্রতিযোগিতার উত্তেজনার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা। ফুটবল শেষ পর্যন্ত মানুষেরই খেলা। ট্রফি আবার জেতা যায়, রেকর্ড আবার গড়া যায়, কিন্তু একটি জীবন কখনও দ্বিতীয়বার ফিরে আসে না।
তথ্যসূত্র: FIFA; Reuters









