
রোম শহরকে মানুষ চেনে ইতিহাসের শহর হিসেবে। এই শহরের পাথুরে রাস্তা, পুরোনো গির্জা আর কলোসিয়ামের ধূসর দেয়াল যেন পৃথিবীর বহু গল্প নিজের ভেতরে ধরে রেখেছে। কিন্তু সেই রোমেরই পশ্চিম প্রান্তে, কাসালত্তি এলাকার ভিয়া মন্তিলিও সড়কের একটি সাধারণ আবাসিক ফ্ল্যাট হঠাৎ এক রাতে হয়ে উঠল ভয়, রক্ত ও কান্নার ঠিকানা। যে ঘরে এক বাংলাদেশি পরিবার নতুন জীবনের আশায় বসতি গড়েছিল, সেই ঘরেই নিভে গেল তিনটি প্রাণ। কামাল উদ্দিন বাবুল (৩৯), তাঁর স্ত্রী আরজু আক্তার (৩৮) এবং তাঁদের ছোট্ট মেয়ে আরওয়া ইসলাম আরিশা (৫) ঘটনাস্থলেই নিহত হন। বড় ছেলে অয়ন (২০) গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনিই এই হত্যাকাণ্ডের একমাত্র জীবিত সাক্ষী। তাঁদের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর কাঁকড়া ইউনিয়নে।
২৬ জুন শুক্রবার রাতে রোমের আকাশে তখন গ্রীষ্মের আলো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল। শহরের ব্যস্ততা কমছিল, মানুষ ঘরে ফিরছিল, কেউ রাতের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সেই সময়ই ভিয়া মন্তিলিও সড়কের ওই ফ্ল্যাটে ঘটে যায় এমন এক হত্যাকাণ্ড, যার অভিঘাত শুধু ইতালির বাংলাদেশি কমিউনিটিকেই নাড়া দেয়নি, শোকের ঢেউ পৌঁছে গেছে বাংলাদেশেও। নোয়াখালীর তাঁদের গ্রামের বাড়িতে এখন কান্না থামছে না। বৃদ্ধ বাবা সিরাজুল ইসলাম বারবার ছেলের নাম ধরে কাঁদছেন। মা জাহানারা বেগম ছেলের মৃত্যু মানতে পারছেন না। পাঁচ বোন হারিয়েছেন তাঁদের একমাত্র ভাইকে। আর গ্রামের মানুষ স্তব্ধ হয়ে ভাবছে, ইতালির দূর শহরে যে পরিবার নিরাপদ জীবনের আশ্রয় খুঁজেছিল, সেই পরিবারই কেন এমন নির্মম পরিণতির মুখোমুখি হলো?
ইতালীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা জরুরি সেবায় খবর দেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই রোমের পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। গুরুতর আহত অয়নকে নেওয়া হয় পলিক্লিনিকো জেমেল্লি হাসপাতালে। চিকিৎসকদের বরাতে জানা গেছে, তাঁর শরীরে গুরুতর আঘাত থাকলেও আপাতত জীবনঝুঁকি নেই। ঘটনাস্থল থেকে ধারালো একটি অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে, যা হত্যায় ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তকারীদের ধারণা।
ঘটনার পরপরই তদন্ত শুরু করে রোম পুলিশের মোবাইল স্কোয়াড। তদন্তকারীরা প্রথম থেকেই পরিবারের পরিচিতজনদের দিকে নজর দেন। প্রতিবেশী, আত্মীয়, বন্ধু, পরিচিত, যাদের সঙ্গে পরিবারের ওঠাবসা ছিল, সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। বাসার ভেতর ফরেনসিক পরীক্ষা চালানো হয়েছে। দেয়ালে হাতের ছাপ, সিঁড়িতে পালানোর চিহ্ন, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, ভুক্তভোগীদের মোবাইল ফোন, সবকিছুই এখন তদন্তের অংশ। তদন্তকারীরা দেখতে চাইছেন, সেই রাতে পরিবারটি কি কাউকে ঘরে ঢুকতে দিয়েছিল? হত্যাকারী কি পরিচিত কেউ ছিল?
এই প্রশ্নের মাঝেই ইতালীয় পুলিশ সন্দেহভাজন হিসেবে প্রকাশ করে এক বাংলাদেশির ছবি। তাঁর নাম শাহাদাত হোসেন। বয়স ৪৩ বছর। জন্ম বাংলাদেশে। রোমের প্রসিকিউটর অফিসের নির্দেশে তাঁর ছবি গণমাধ্যমে, পুলিশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে প্রকাশ করা হয়। এখান থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের কাহিনি আরও জটিল হয়ে ওঠে। কারণ, শাহাদাত হোসেন নিহত পরিবারের অপরিচিত কেউ নন। তাঁর বাড়িও কোম্পানীগঞ্জের চর কাঁকড়া ইউনিয়নে। তাঁর পিতার নাম আবদুল আহাদ।
সৌদি আরবে প্রবাসী শাহাদাতের বড় ভাই বলেছেন, শাহাদাত প্রায় চার বছর আগে পরিবারের সম্পত্তির অংশ বিক্রি করে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাজ্যে যান। পরে পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ কমে যায় এবং এক পর্যায়ে তাঁর দাম্পত্য জীবনও ভেঙে যায়। ব্যক্তিগত বিচ্ছিন্নতা, প্রবাসজীবনের অনিশ্চয়তা এবং পুরোনো সম্পর্কের টানাপোড়েন এখন তদন্তকারীদের সামনে একটি জটিল প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।
নিহত পরিবারের স্বজনরা বলছেন, কামাল উদ্দিন বাবুল ২০০৯ সালে ইতালিতে যান। দীর্ঘদিন তিনি একাই প্রবাসজীবন কাটান। সে সময় তাঁর স্ত্রী ও সন্তানরা বাংলাদেশে ছিলেন। স্বজনদের অভিযোগ, ওই সময় শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে আরজু আক্তারের সম্পর্ক তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে গ্রামে সালিশও হয়েছিল বলে তারা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বিরোধের পরই বাবুল স্ত্রী ও সন্তানদের ইতালিতে নিয়ে যান, যেন দূরত্বে থেকে পুরোনো সংকটের ইতি টানা যায়।
কিন্তু দূরত্ব সবসময় সম্পর্কের আগুন নিভাতে পারে না। স্বজনদের অভিযোগ, স্ত্রী-সন্তানদের ইতালিতে নিয়ে যাওয়ার পরও শাহাদাত ওই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। কেউ কেউ বলছেন, তিনি যুক্তরাজ্য থেকে পরে ইতালিতে যান এবং আরজুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।
ইতালীয় সূত্রগুলো বলছে, তদন্তকারীরা ধারণা করছেন হামলাকারী পরিবারের পরিচিত হতে পারেন। কারণ দরজা ভেঙে ঢোকার স্পষ্ট তথ্য এখনো সামনে আসেনি। তাই সেই রাতে ঘরের দরজা কীভাবে খুলেছিল, সেটিই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। কিছু সূত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডটি হয়তো এক ধাপে ঘটেনি। প্রথমে মা ও শিশুকন্যার ওপর হামলা হয়, পরে বাবা ও ছেলে ঘরে ফিরে আসার পর আরও সংঘর্ষ ঘটে।
পরিবারটি কমিউনিটিতে পরিচিত ছিল। কামাল উদ্দিন বাবুল স্থানীয় একটি সুপারমার্কেটে কাজ করতেন। তাঁকে অনেকেই পরিশ্রমী, শান্ত এবং সহায়তাপরায়ণ মানুষ হিসেবে চিনতেন।
রোমের ভিয়া মন্তিলিও সড়কের সেই ফ্ল্যাট এখন পুলিশের তদন্তস্থল। রোমের প্রসিকিউটর অফিস হত্যা ও গুরুতর হামলার অভিযোগে তদন্ত শুরু করেছে। সন্দেহভাজন শাহাদাত হোসেনকে খুঁজতে তাঁর ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। তদন্তকারীরা প্রমাণ সংগ্রহ করছেন। আর একমাত্র জীবিত সাক্ষী অয়ন হাসপাতালের বিছানায়। তিনি সুস্থ হয়ে পূর্ণাঙ্গ জবানবন্দি দিতে পারলে সেই রাতের অনেক অজানা দিক সামনে আসতে পারে। তিনি কী দেখেছেন, ঘরে ঢুকে কী পেয়েছেন, হামলাকারীকে চিনেছিলেন কি না, তাঁর বক্তব্যই এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সবার বিশ্বাস।
তথ্যসূত্র:
ANSA (২৮ জুন ২০২৬)
Rai News (২৮ জুন ২০২৬)









