
উত্তর ইউরোপের মানচিত্রে সুইডেন এক আশ্চর্য দেশ। বাল্টিক সাগরের নীল জলরেখা, অসংখ্য হ্রদ, গভীর বন, দীর্ঘ শীত আর গ্রীষ্মের দীর্ঘ আলোয় ঘেরা এই দেশকে বিশ্ব শুধু উন্নত অর্থনীতির জন্য চেনে না; চেনে মানুষের জীবনকে মর্যাদা দেওয়ার জন্যও। সেই সুইডেনেরই এক তরুণী মন্ত্রী একদিন লুক্সেমবার্গের আনুষ্ঠানিক বৈঠককক্ষে এমন এক দৃশ্য তৈরি করলেন, যা রাজনীতির কঠিন টেবিলেও জীবনের উষ্ণতা ফিরিয়ে আনল। সেদিন ইউরোপের মন্ত্রীরা বসেছিলেন জলবায়ু, পরিবেশ, গাড়ির কার্বন নিঃসরণ, পানি সংকট আর ভবিষ্যতের নীতি নিয়ে কথা বলতে। টেবিলের ওপর ছিল ফাইল, মাইক্রোফোন, রাষ্ট্রীয় কাগজপত্র। কিন্তু সেই কঠিন আলোচনার মাঝখানে হঠাৎ সবচেয়ে মানবিক দৃশ্য হয়ে উঠল এক তিন মাসের শিশু। তার নাম আদম। আর তাকে কোলে নিয়ে বৈঠকে যোগ দেওয়া নারীটি সুইডেনের জলবায়ু ও পরিবেশমন্ত্রী রোমিনা পুরমোখতারি। আদম কোনো বক্তব্য দেয়নি, কোনো প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেনি, কোনো ভোটে অংশ নেয়নি। তবু সেদিন বৈঠককক্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল তারই। কারণ ইউরোপের মন্ত্রীরা যখন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পৃথিবী নিয়ে কথা বলছিলেন, সেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের এক ছোট্ট মুখ তখন তাঁদের সামনে বসে ছিল মায়ের কোলে।
রোমিনা মোখতারি শুধু একজন মন্ত্রী নন। তিনি সুইডেনের রাজনীতির নতুন প্রজন্মের এক দৃশ্যমান মুখ। ১৯৯৫ সালে জন্ম নেওয়া এই রাজনীতিক ২০২২ সালে সুইডেনের জলবায়ু ও পরিবেশমন্ত্রী হন। তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৬। সেই বয়সেই তিনি সুইডেনের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী হওয়ার নজির গড়েন। এর আগে তিনি লিবারেল ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের চেয়ার ছিলেন এবং ২০২২ সালে রিক্সডাগের সদস্য নির্বাচিত হন। রোমিনার পরিবার ইরানি শিকড়ের। তাঁর বাবা রাজনৈতিক শরণার্থী হিসেবে সুইডেনে এসেছিলেন। ফলে স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্ন তাঁর জীবনের খুব দূরের কোনো রাজনৈতিক শব্দ নয়; এগুলো তাঁর পারিবারিক স্মৃতির ভেতরেই জড়িয়ে আছে।
রোমিনার কোলে সন্তানের উপস্থিতি কোনো আকস্মিক দৃশ্য ছিল না। এটি ছিল এক রাজনৈতিক বার্তা, তবে স্লোগান দিয়ে নয়; জীবনের বাস্তবতা দিয়ে। রোমিনা সদ্য মাতৃত্বকালীন ছুটি শেষে কাজে ফিরেছেন। তাঁর স্বামী এখন পিতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন এবং তিনিও লুক্সেমবার্গে গিয়েছিলেন শিশুটির দেখাশোনার জন্য। রোমিনা যেন বলতে চেয়েছেন, একজন নারীকে মা হওয়া আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করার মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করা সভ্য সমাজের কাজ নয়।
সুইডেনের সমাজব্যবস্থাই তাঁকে এই সাহসের ভিত দিয়েছে। সেখানে সন্তান জন্মের পর বাবা-মা মোট ৪৮০ দিন বা প্রায় ১৬ মাসের পেইড প্যারেন্টাল লিভ পান। দুই অভিভাবকের ক্ষেত্রে প্রত্যেকে ২৪০ দিনের অধিকারী। এর মধ্যে ৯০ দিন প্রত্যেকের জন্য আলাদা করে সংরক্ষিত থাকে, যা অন্যজনকে দেওয়া যায় না। এই ব্যবস্থার মূল দর্শন হলো, সন্তান শুধু মায়ের দায়িত্ব নয়; বাবারও সমান দায়িত্ব।
রোমিনার পদক্ষেপ তাই কেবল ব্যক্তিগত সাহসের গল্প নয়। এটি কর্মক্ষেত্র, পরিবার, নারী নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় নীতির একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। অফিস কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ অফিসের জন্য? সংসদ, মন্ত্রণালয়, বোর্ডরুম, নিউজরুম, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত, করপোরেট অফিস, সব জায়গাতেই এই প্রশ্ন জরুরি। কর্মক্ষেত্রের পুরোনো ধারণা দীর্ঘদিন ধরে মাকে যেন অস্বস্তিকর জায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে। সন্তানকে সময় দিলে পেশাগত অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আর কাজে ফিরলে মাতৃত্বের অপরাধবোধ তাঁকে তাড়া করে। রোমিনা সেই পুরোনো ফাঁদে পা দেননি। তিনি সন্তানকে লুকিয়ে রাখেননি। মাতৃত্বকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা বানাননি। বরং ইউরোপের নীতি নির্ধারণের টেবিলে বসেই দেখিয়েছেন, জীবন ও কাজ আলাদা দ্বীপ নয়।
তবে এই দৃশ্যকে শুধু আবেগ দিয়ে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে আছে রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সামাজিক মনোভাব এবং পারিবারিক সহযোগিতা। রোমিনা নিজেও বলেছেন, শুধু দীর্ঘ ছুটি দিলেই হবে না; দরকার নমনীয় নিয়ম, সাশ্রয়ী শিশু পরিচর্যা এবং এমন পরিবেশ, যেখানে বাবা-মা কাজ ও পরিবার দুটোই সামলাতে পারেন। তাঁর ভাষায়, পরিবারবান্ধব নীতি শুধু মানবিক নয়, অর্থনীতির দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
রোমিনা মোখতারি কাউন্সিল বৈঠকে শিশুকে নিয়ে গিয়ে শুধু নিজের সন্তানকে কাছে রাখেননি; তিনি ইউরোপের টেবিলে এক পুরোনো ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, নেতৃত্ব মানে জীবনের বাস্তবতাকে সঙ্গে নিয়েই সামনে এগোনো। আর কোনো সভাকক্ষ যদি একটি শিশুর উপস্থিতি সহ্য করতে না পারে, তাহলে সেই সভাকক্ষ ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলার নৈতিক অধিকার কতটা রাখে, প্রশ্নটি সেখানেই থেকে যায়।
এই গল্প তাই শুধু একজন সুইডিশ মন্ত্রীর নয়। এটি পৃথিবীর প্রতিটি কর্মজীবী মায়ের গল্প, যারা প্রতিদিন সন্তানের মুখ আর দায়িত্বের ফাইলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকেন। সন্তানকে কোলে নেবেন, নাকি ফাইল হাতে অফিসে যাবেন? ঘরে থাকলে পেশা হারানোর ভয়, কাজে ফিরলে অপরাধবোধের তাড়া। সমাজ যেন তাঁদের সামনে সব সময় দুটি দরজা দাঁড় করিয়ে রাখে। এক দরজায় লেখা মা, অন্য দরজায় লেখা পেশাজীবী। রোমিনা মোখতারি সেদিন দুটো দরজাই একসঙ্গে খুলে দিয়ে দেখালেন, মাতৃত্ব ও নেতৃত্ব পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; তারা একই জীবনের দুই আলোকিত দিক।
তথ্যসূত্র:
Reuters, ২৫ জুন ২০২৬
Government of Sweden, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬









