সম্পাদকের পাতা

হলুদ জার্সিতে নেইমারের অশ্রুভেজা প্রত্যাবর্তন

নজরুল মিন্টো

দীর্ঘ ৯৮১ দিন পর ব্রাজিলের হলুদ জার্সি গায়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়ালেন তিনি। যে জার্সি একসময় তাঁর কাছে ছিল স্বপ্নের, সেই জার্সিই আবার তাঁর চোখ ভিজিয়ে দিল মায়ামি গার্ডেন্সের সবুজ ঘাসে। এই কান্না পরাজয়ের ছিল না। এটি ছিল ফিরে আসার কান্না। ঘড়ির কাঁটায় তখন ম্যাচের ৭৬ মিনিট। ফোর্থ অফিশিয়ালের বোর্ডে সবুজ আলোয় জ্বলে উঠল ব্রাজিলের দশ নম্বর। ডাগআউট থেকে সাইডলাইনে এসে দাঁড়াতেই গ্যালারি যেন নিজের পুরোনো নায়ককে চিনে ফেলল। হাজার হাজার দর্শক একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, নেইমার, নেইমার।

মাঠে নামার আগে নেইমার ঘাস ছুঁয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। কারও চোখে এটি হয়তো সাধারণ এক ভঙ্গি মনে হতে পারে। কিন্তু যারা তাঁর দীর্ঘ পথচলা জানেন, তারা বুঝবেন, সেই স্পর্শে ছিল বহু অস্ত্রোপচার পেরিয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও প্রার্থনার গভীর অনুভূতি। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর তিনি আর ব্রাজিলের হয়ে খেলেননি। হাঁটুর বড় চোট, তারপর বারবার ফিটনেসের সংকট, পায়ের পেশির ইনজুরি, সব মিলিয়ে একসময় প্রশ্ন উঠেছিল, নেইমার কি আর কখনও বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জার্সি গায়ে মাঠে নামতে পারবেন?

স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সেই প্রশ্নের উত্তর মিলল। নেইমার শুরু থেকে মাঠে ছিলেন না; অপেক্ষা করছিলেন বেঞ্চে। ব্রাজিলের কোচ কার্লো আনচেলত্তি জানতেন, তাঁকে আবেগ দিয়ে নয়, শরীরের অনুমতি নিয়েই মাঠে নামাতে হবে। ম্যাচের ৭৬ মিনিটে ৯ নম্বর জার্সিধারী মাতেউস কুনিয়ার জায়গায় নামলেন নেইমার। সময় পেলেন অল্প, কিন্তু ফুটবলে কখনও কখনও অল্প সময়ও ইতিহাসের মতো বড় হয়ে যায়।

মাত্র প্রায় ২০ মিনিটের সেই ছোট্ট উপস্থিতিতেও নেইমার বল স্পর্শ করেছেন ২৪ বার। কিন্তু সংখ্যার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাঁর আবেগ। শেষ বাঁশির পর আর নিজেকে সামলাতে পারেননি তিনি। ড্রেসিংরুমে গিয়ে একা কেঁদেছেন। পরে নেইমার বলেন, এতদিন পর এই অভিজ্ঞতা আবার পাওয়া তাঁর কাছে ছিল বিশাল স্বস্তি, কৃতজ্ঞতার মুহূর্ত। ব্রাজিলের হয়ে এতদিন জার্সি পরেছেন, কিন্তু দীর্ঘ অনুপস্থিতির পর সেই জার্সির ওজন যেন নতুন করে অনুভব করেছেন তিনি। মাঠের পাশে পরিবারের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর সেই কান্নায় মিশে যায় আনন্দের আলো। যেন ফুটবলারের সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষও ফিরে এলেন। এই ম্যাচে মাঠে নেমে ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ ও ২০২৬, চারটি বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জার্সি গায়ে খেলার অভিজ্ঞতাও হলো তাঁর।

নেইমারের গল্প শুরু হয়েছিল ব্রাজিলের সাও পাওলো রাজ্যের মোগি দাস ক্রুজেস শহরে। ১৯৯২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্ম। শৈশবে ছোট কোর্টে দ্রুতগতির ফুটবল, রাস্তার খেলা, ছোট মাঠ আর দ্রুত পায়ের ছন্দই তাঁর খেলাকে আলাদা করে গড়ে তোলে। ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব সান্তোস তাঁকে প্রথম বড় মঞ্চ দেয়। এই ক্লাবের জার্সিতেই একসময় ফুটবলের জাদুকর হিসেবে খ্যাত পেলে পৃথিবীকে মুগ্ধ করেছিলেন। সেই সান্তোসেই ২০০৯ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে নেইমারের মূল দলে অভিষেক। ২০১১ সালে সান্তোস দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে বড় ক্লাব প্রতিযোগিতা কোপা লিবার্তাদোরেস জেতে, আর সেই সাফল্যের কেন্দ্রে ছিলেন নেইমার।

২০১৩ সালে তিনি বার্সেলোনায় যান। ইউরোপীয় ফুটবল তখন মেসি ও রোনালদোর যুগে আবর্তিত। সেই সময়ে নেইমার বার্সেলোনায় এসে মেসি ও লুইস সুয়ারেজের সঙ্গে গড়ে তোলেন এমএসএন। তিনজন মিলে ফুটবলকে এমন এক আক্রমণভাগ দিয়েছিলেন, যা ছিল একই সঙ্গে সুন্দর ও ভয়ংকর। ২০১৪-১৫ মৌসুমে বার্সেলোনা ট্রেবল জেতে। নেইমার তখন আর শুধু সম্ভাবনা নন, পরীক্ষিত তারকা।

কিন্তু এই উত্থানের মাঝখানেই এসে দাঁড়ায় ২০১৪ সালের ৪ জুলাই। ব্রাজিলের ফোরতালেজা শহরের বড় স্টেডিয়াম এস্তাদিও কাস্তেলাও। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। ব্রাজিল বনাম কলম্বিয়া। গোটা ব্রাজিল তখন নেইমারের কাঁধে স্বপ্ন রেখেছে। ম্যাচের শেষ দিকে কলম্বিয়ার ডিফেন্ডার হুয়ান ক্যামিলো জুনিগা পেছন থেকে এসে নেইমারের পিঠে হাঁটু দিয়ে আঘাত করেন। নেইমার মাটিতে পড়ে যান। মুহূর্তেই বোঝা যায়, বিষয়টি সাধারণ ফাউল নয়। পরে পরীক্ষায় ধরা পড়ে, তাঁর মেরুদণ্ডের একটি হাড়ে ফাটল ধরেছে। ব্রাজিল জিতেছিল ২-১ গোলে। কিন্তু সেদিন জয়ও শোকের মতো ভারী হয়ে গিয়েছিল।

সেই আঘাত নিয়ে বিতর্ক আজও শেষ হয়নি। জুনিগা পরে বলেন, তিনি ইচ্ছা করে নেইমারকে আঘাত করেননি। ফিফা তাঁর বিরুদ্ধে পরবর্তী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। ফুটবল শরীরের খেলা, কিন্তু শরীর ভাঙার খেলা নয়। নিয়মের বইয়ে ঘটনাটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয়ে ওঠেনি, কিন্তু সমর্থকের স্মৃতিতে সেটি থেকে গেছে ফুটবলের এক কালো রাত হিসেবে।

একজন ২২ বছরের তরুণ, যে নিজের দেশে বিশ্বকাপ জেতার স্বপ্ন দেখছিল, হঠাৎ স্ট্রেচারে শুয়ে মাঠ ছাড়ল। ব্রাজিল সেমিফাইনালে উঠল, কিন্তু নেইমার ছাড়া সেই সেমিফাইনাল ছিল আত্মাহীন। তারপর জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের লজ্জা। অনেকেই আজও মনে করেন, নেইমার থাকলে ইতিহাস অন্যরকম হতে পারত। হয়তো ফল বদলাত না, কিন্তু ব্রাজিলের মন এত ভেঙে পড়ত না।

২০১৮ বিশ্বকাপের আগে পায়ের হাড়ের ইনজুরি তাঁর প্রস্তুতিকে নষ্ট করে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও গোড়ালির চোট তাঁকে তাড়া করে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে তাঁর গোলটি ছিল শিল্পীর শেষ আলো জ্বালানোর মতো, কিন্তু টাইব্রেকারে ব্রাজিল বিদায় নেয়। নেইমার মাঠে বসে কাঁদেন। সেই কান্না শুধু হারের ছিল না। সেটি ছিল আরেকটি বিশ্বকাপ হাতছাড়া হওয়ার কান্না।

জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর অর্জন তবু বিশাল। ব্রাজিলের হয়ে ৭৯ গোল করে তিনি দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০১৬ রিও অলিম্পিকে ব্রাজিলকে ফুটবলে প্রথম স্বর্ণপদক এনে দেওয়ার পথেও তিনি ছিলেন প্রধান চরিত্র। কিন্তু ব্রাজিলে ফুটবলারের বিচার অনেক সময় নির্মম। সেখানে শুধু দক্ষতা যথেষ্ট নয়। বিশ্বকাপ চাই। নেইমার সেই ট্রফি এখনও পাননি। তাই তাঁর সাফল্যের পাশে সবসময় একটি দীর্ঘশ্বাস দাঁড়িয়ে থাকে।

২০১৭ সালে বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে তাঁর যাওয়া ছিল ফুটবল অর্থনীতির ইতিহাস বদলে দেওয়া ঘটনা। ২২২ মিলিয়ন ইউরোর ট্রান্সফার তাঁকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি ফুটবলার বানায়। এরপর আসে আল হিলাল অধ্যায়। ২০২৩ সালে সৌদি আরবের এই ক্লাবে তাঁর যাওয়া অনেকের কাছে ছিল ক্যারিয়ারের নতুন অধ্যায়। কিন্তু সেখানেও শরীর তাঁর পাশে দাঁড়াল না। ২০২৩ সালের অক্টোবরে উরুগুয়ের বিপক্ষে ব্রাজিলের হয়ে খেলতে গিয়ে হাঁটুর গুরুতর চোটে পড়েন তিনি। তারপর অস্ত্রোপচার, পুনর্বাসন, দীর্ঘ অপেক্ষা।

২০২৫ সালে তিনি ফিরে যান শৈশবের ক্লাব সান্তোসে। এই ফিরে আসা ছিল শুধু ক্লাব বদল নয়, নিজের কাছে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা। বলেছিলেন, সান্তোস তাঁর ঘর। এই ঘর থেকেই তিনি আবার বিশ্বকাপের পথে ফিরেছেন।

কোচ কার্লো আনচেলত্তি নেইমারকে সহজে ডাকেননি। বারবার বলেছেন, ফিট না হলে নেইমারের জায়গা নেই। কারণ বর্তমান ব্রাজিল আর ২০১৪ সালের ব্রাজিল নয়। তখন নেইমারই ছিল দলের একমাত্র সূর্য। এখন আক্রমণের কেন্দ্রে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ২০২৬ সালের ২৪ জুন মায়ামি গার্ডেন্সে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ভিনিসিয়ুস দুই গোল করেছেন, মাতেউস কুনিয়া করেছেন আরেকটি। ব্রাজিল গ্রুপ সি-তে শীর্ষে উঠে নকআউটে গেছে। দল এখন নেইমার ছাড়া খেলতে পারে, জিততেও পারে। এটাই সময়ের বদল।

নেইমারের ক্যারিয়ার যদি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ছাড়া শেষও হয়, তবু তা শূন্য গল্প হবে না। কারণ সব কিংবদন্তির হাতে ট্রফি থাকে না। কারও কারও গল্প থাকে স্মৃতিতে, অসম্পূর্ণতার সৌন্দর্যে। ব্রাজিল এখন ভিনিসিয়ুসের গতিতে এগোচ্ছে, আনচেলত্তির পরিকল্পনায় এগোচ্ছে, নতুন প্রজন্মের কাঁধে এগোচ্ছে। তবু হলুদ জার্সির দশ নম্বর যখন সাইডলাইনে দাঁড়ায়, তখন পৃথিবী একবার তাকায়। কারণ সেই জার্সিতে এখনও লেখা থাকে একটি নাম, নেইমার।

তথ্যসূত্র:
The Business Standard, ২৬ জুন ২০২৬
Reuters, ২৫ জুন ২০২৬
NBC Miami, ২৪ জুন ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language