
২০২৬ সালের ১৮ জুন, ভ্যাঙ্কুভারের বিসি প্লেস স্টেডিয়ামে কাতারের মুখোমুখি হয়েছিল কানাডা। সেদিন শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ হয়নি; হয়েছে কানাডার ফুটবল-ইতিহাসের এক অগ্নিপরীক্ষা। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আলফোনসো ডেভিস কানাডার হয়ে বিশ্বকাপে দেশের প্রথম গোলটি করেছিলেন। কিন্তু সেই গোল কানাডাকে জয় এনে দিতে পারেনি। ২০২৬ সালে, নিজের দেশে বিশ্বকাপের মঞ্চে দাঁড়িয়ে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটাতে নেমেছিল কানাডা।
ম্যাচের শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল, কানাডা ইতিহাসের দরজায় শুধু কড়া নাড়তে আসেনি, দরজাটি খুলে ভেতরে ঢুকতেই এসেছে। কানাডার কোচ জেসি মার্শের দল বলের দখল ধরে রাখছিল, একের পর এক আক্রমণ গড়ছিল এবং কাতারকে নিজেদের অর্ধেই ব্যস্ত রাখতে বাধ্য করছিল। স্টেডিয়ামে সমর্থকদের চিৎকার যেন খেলোয়াড়দের ডেকে বলছিল, আজ থামা যাবে না।
প্রথম গোল আসে সাইল লারিনের পা থেকে। কাতারের রক্ষণভাগ বক্সের ভেতর বল ঠিকমতো সরাতে না পারায় সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কানাডা এগিয়ে যায়। এরপর জোনাথন ডেভিডের গোলে ব্যবধান বাড়ে। তাজন বুকানানকে থামাতে গিয়ে কাতারের হোমাম আহমেদ লাল কার্ড দেখলে দলটি ১০ জনে নেমে যায়। বিরতিতে যাওয়ার আগেই স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৩-০, আর ম্যাচ তখন পুরোপুরি কানাডার নিয়ন্ত্রণে।
কিন্তু ফুটবল কখনও কেবল আনন্দের সরল রেখা মেনে চলে না। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৩ মিনিটে সেই আনন্দের ওপর নেমে আসে ভয়ংকর ছায়া। কাতারের মিডফিল্ডার আসিম মাদিবো পেছন দিক থেকে ইসমাইলকে ট্যাকল করেন। মুহূর্তের মধ্যে তিনি মাটিতে পড়ে যান। তাঁর বাঁ পায়ের অবস্থা দেখে সতীর্থরা বুঝে যান, বিষয়টি গুরুতর। অধিনায়ক স্টিফেন ইউস্তাকিও ছুটে যান।
ঘটনাটি ঘটে কানাডার বেঞ্চের সামনে। কোচ জেসি মার্শ বলেন, হাড় ভাঙার শব্দ পর্যন্ত শোনা গেছে। মোইস বোম্বিতোর কাছে শব্দটি আরও নির্মমভাবে পরিচিত ছিল। নিজে পা ভেঙে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকার পর এই ম্যাচেই তিনি বিশ্বকাপে প্রথমবার ফিরেছিলেন। মাঠে ফেরার কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি দেখলেন, তাঁরই সহযোদ্ধা ইসমাইল একই দুর্ভাগ্যের শিকার।
প্রথমে হলুদ কার্ড দেখানো হলেও ভিডিও রিভিউর পর মাদিবোকে লাল কার্ড দেখানো হয়। পরে জানা যায়, তিনি কানাডার ড্রেসিংরুমে গিয়ে ইসমাইলের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে কানাডার খেলোয়াড়দের চোখে ছিল শোক, ক্ষোভ ও অবিশ্বাস।
স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়ার সময়ও ইসমাইল কানাডার দর্শকদের দিকে হাত নাড়েন। ব্যথার মাঝেও তাঁর সেই অভিবাদনে ছিল সাহসের ইঙ্গিত। সাইডলাইনের কাছে আসতেই কোচ জেসি মার্শ এগিয়ে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। মার্শ এ বছর ইসমাইলকে কানাডার মাঝমাঠের অন্যতম ভরসা হিসেবে দেখেছেন। সেই খেলোয়াড়ই যখন চোখের সামনে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেলেন, কোচের আলিঙ্গনে তাই শুধু সান্ত্বনা নয়, ছিল ব্যথা ও অসহায়তার গভীর ছাপ।
কানাডা থামেনি। ইসমাইলের বদলি হিসেবে নামা নাথান সালিবা ১০ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে কানাডার পক্ষে চতুর্থ গোল করেন। গোলের পর তিনি সাইডলাইনে ছুটে গিয়ে তুলে ধরেন ইসমাইলের ৮ নম্বর জার্সি। গ্যালারি আবার গর্জে ওঠে, তবে সেই উল্লাসে মিশে ছিল কান্নার সুরও।
এরপর কানাডা আরও এগোয়। কাতার তখন ৯ জনের দল। জ্যাকব শ্যাফেলবার্গের আক্রমণ থেকে মোহামেদ আল মান্নাইয়ের আত্মঘাতী গোল হয়, পরে জোনাথন ডেভিড হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন। শেষ পর্যন্ত ৬-০ গোলের জয় পায় কানাডা। ব্যবধানটি বড়, কিন্তু রাতটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা ছিল না ছয়। ছিল এক। বিশ্বকাপে কানাডার প্রথম জয়।
ডেভিডের হ্যাটট্রিকও ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। তিনি আগে থেকেই কানাডার ফুটবল দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। কিন্তু এই রাতের তিন গোল শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বিশ্বকাপে কানাডার প্রথম জয়ের স্মৃতিতে তাঁর নামও স্থায়ীভাবে লেখা হয়ে গেল।
ম্যাচ শেষে কানাডার আনন্দে মিশে ছিল বিষাদ। তারা জিতেছে, ইতিহাস লিখেছে, গ্রুপ বি-তে শীর্ষে উঠেছে। কিন্তু উদযাপনের ভেতরেও বারবার ফিরে এসেছে একটি নাম: ইসমাইল। কানাডার অধিনায়ক স্টিফেন ইউস্তাকিওর কথায়, দেশের জন্য এমন সুন্দর একটি দিন তৈরি করার পরও ইসমাইলের আঘাত তাঁদের আনন্দকে পূর্ণ হতে দেয়নি।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ম্যাচটি দেখেছেন স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়ে, ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পাশে বসে। পরে তিনি কানাডা দলের ড্রেসিংরুমে গিয়ে খেলোয়াড়দের অভিনন্দন জানান। ইসমাইলের ভয়াবহ আঘাতের পরও কানাডার খেলোয়াড়রা যেভাবে ভেঙে না পড়ে নিজেদের সামলে নিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত জয় নিশ্চিত করেছেন, কার্নি সেটিকেই তাঁদের মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় হিসেবে দেখেছেন। তাঁর ভাষায়, এই খেলোয়াড়রা শুধু একটি ম্যাচ খেলেননি; তাঁরা কানাডার পতাকাকেও মর্যাদার সঙ্গে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
এখন প্রশ্ন শুধু আবেগের নয়। ইসমাইলকে ছাড়া কানাডা কত দূর যেতে পারবে? জেসি মার্শ নিজেই বলেছেন, তাঁর দলে আর ইসমাইলের মতো খেলোয়াড় নেই। ইসমাইল ছিলেন এক্স-ফ্যাক্টর। মাঝমাঠে তিনি তাড়াহুড়া করতেন না, জায়গা খুঁজে নিতেন, আক্রমণ ও রক্ষণকে সংযোগ দিতেন। বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচসেরা পারফরম্যান্সের পর কাতারের বিপক্ষেও তিনি দারুণ ছন্দে ছিলেন।
তবু কানাডার সামনে পথ খুলে গেছে। গ্রুপ বি-তে দুই ম্যাচ শেষে কানাডা ও সুইজারল্যান্ড শক্ত অবস্থানে। সুইজারল্যান্ড একই দিনে বসনিয়া-হার্জেগোভিনাকে ৪-১ গোলে হারিয়েছে। কানাডার শেষ গ্রুপ ম্যাচ আগামী বুধবার ভ্যাঙ্কুভারেই সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে। ড্র করলেই কানাডা গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে থাকবে। জয় পেলে হিসাব আরও সহজ।
গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে কানাডা ভ্যাঙ্কুভারেই থেকে ২ জুলাই রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচ খেলবে। প্রতিপক্ষ হবে গ্রুপ ই, এফ, জি, আই বা জে-এর কোনো তৃতীয় স্থানের দল। সুইজারল্যান্ডের কাছে হারলে কানাডা প্রায় নিশ্চিতভাবে গ্রুপে দ্বিতীয় হবে। সে ক্ষেত্রে ২৮ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে রাউন্ড অব ৩২ ম্যাচ খেলতে হবে। আর অস্বাভাবিকভাবে তৃতীয় হলে সামনে আসতে পারে আরও কঠিন পরীক্ষা: নিউ জার্সিতে সম্ভাব্য জার্মানি, অথবা সান্তা ক্লারায় সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র।
এই হিসাবের মধ্যেই কানাডার জন্য বড় আশার নাম আলফোনসো ডেভিস। বায়ার্ন মিউনিখে খেলা এই কানাডিয়ান তারকা আঘাত কাটিয়ে ফেরার পথে। ম্যাচ শেষে সতীর্থরা যখন উদযাপনে ব্যস্ত, তিনি তখন পুরো মাঠজুড়ে শাটল রান ও স্প্রিন্ট করছিলেন। কানাডার প্রধান কোচ জেসি মার্শের কথায়, কানাডা বিশ্বকাপে যত বেশি দিন টিকে থাকবে, ডেভিস তত বেশি সময় পাবেন শতভাগ ফিট হয়ে দলের নকআউট অভিযানে ভূমিকা রাখার জন্য। ইসমাইলের অনুপস্থিতিতে ডেভিসের পূর্ণ ফিটনেসে ফেরা কানাডার জন্য বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
১৮ জুনের ভ্যাঙ্কুভারের দিনটি কানাডার ফুটবল ইতিহাসে আলাদা হয়ে থাকবে। সেদিন কানাডা শুধু কাতারকে হারায়নি, নিজেদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নতুন অধ্যায়ও লিখেছে। তারা এখন শুধু বিশ্বকাপ আয়োজনকারী দেশ নয়; বিশ্বকাপে জয় পাওয়া দেশ, নকআউটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দেশ।
তথ্যসূত্র: টরন্টো স্টার, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স, গার্ডিয়ান, ফিফা।









