সম্পাদকের পাতা

শরণার্থী শিবির থেকে কানাডার বিশ্বকাপে আলফান্সো ডেভিস

নজরুল মিন্টো

বিশ্বকাপের মাঠে শুধু ফুটবল খেলা হয় না। সেখানে একেকটি দেশের পতাকার সঙ্গে উঠে আসে মানুষের জীবন, পরিবারের ইতিহাস, শৈশবের দুঃখ, অভিবাসনের পথ, যুদ্ধের ক্ষত এবং নতুন করে বেঁচে ওঠার স্বপ্ন। দর্শকরা টেলিভিশনের পর্দায় দেখেন গতি, গোল, ড্রিবল, করতালি আর উল্লাস। কিন্তু প্রতিটি জার্সির আড়ালে থাকে লক্ষ্যে পৌঁছানোর দীর্ঘ এক গল্প।

আলফান্সো ডেভিস সেই রকমই এক গল্পের নাম। তিনি এখন কানাডিয়ান ফুটবলের এক বড় প্রতীক। যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল শরণার্থী শিবিরে, সে আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসরে কানাডার স্বপ্ন বহন করছে।

আলফান্সো ডেভিসের বাবা-মা এসেছিলেন লাইবেরিয়া থেকে। গৃহযুদ্ধ তাঁদের জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছিল ঘর, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা। বেঁচে থাকার তাগিদে তাঁরা আশ্রয় নেন ঘানার বুদুবুরাম শরণার্থী শিবিরে। সেই শিবিরেই ২০০০ সালের ২ নভেম্বর জন্ম নেন আলফান্সো বয়েল ডেভিস। ছোট বেলায় তাঁর সামনে কোনো স্টেডিয়াম ছিল না, ছিল না কোনো উন্নত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ছিল শুধু অনিশ্চয়তার ভেতরে বেঁচে থাকার চেষ্টা।

শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া শিশুরা পৃথিবীকে একটু ভিন্নভাবে দেখতে শেখে। তাদের জীবনের প্রথম পাঠ নিরাপত্তা নয়, অনিশ্চয়তা। কিন্তু মানুষের জীবন কখনও কখনও সবচেয়ে কঠিন জায়গা থেকেই সবচেয়ে বড় যাত্রা শুরু করে। ডেভিস পরিবারের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। আলফান্সো যখন ছোট, তাঁর পরিবার কানাডায় আসে। প্রথমে অন্টারিও, পরে আলবার্টার এডমন্টন। বরফের দেশ, নতুন ভাষা, নতুন সমাজ, নতুন নিয়ম, নতুন সংগ্রাম।

অভিবাসী পরিবারের সন্তানরা খুব দ্রুত বড় হয়ে যায়। তারা ঘরের ভেতর বাবা-মায়ের ক্লান্তি দেখে, বাইরে নতুন দেশের বাস্তবতা শেখে। তারা বুঝে যায়, শুধু স্বপ্ন দেখলেই হয় না, নতুন বাস্তবতার ভেতরে নিজের জায়গাও তৈরি করতে হয়। আলফান্সোর জীবনে সেই সুযোগের দরজা খুলেছিল ফুটবলের মাধ্যমে। এডমন্টনের মাঠে, স্কুলে, ছোট ক্লাবে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে খেলতে তাঁর ভেতরের গতি ধরা পড়তে থাকে। সেই গতি শুধু পায়ের ছিল না, ছিল জীবনেরও।

আলফান্সো প্রথম সংগঠিত ফুটবল খেলেন এডমন্টনের ‘Free Footie’ ধরনের এমন এক পরিবেশে, যেখানে অর্থের অভাবে খেলাধুলা থেকে দূরে থাকা শিশুদের জন্য সুযোগ তৈরি করা হতো। নতুন দেশে এসে ফুটবল তাঁকে শুধু খেলোয়াড় বানায়নি, দিয়েছে বন্ধুত্ব, আত্মবিশ্বাস ও নিজের জায়গা করে নেওয়ার সাহস। পরে তিনি এডমন্টন ইন্টারন্যাশনালস, এডমন্টন স্ট্রাইকার্স হয়ে ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপসের একাডেমিতে যোগ দেন।

২০১৬ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি পেশাদার ফুটবলে পা রাখেন। অল্প বয়সেই ভ্যাঙ্কুভার হোয়াইটক্যাপসের জার্সিতে তাঁর আবির্ভাব কানাডিয়ান ফুটবলে নতুন আলোড়ন তোলে। দ্রুতগতির এই কিশোর মাঠে নামলেই বোঝা যেত, তার মধ্যে আলাদা কিছু আছে। সে শুধু বল নিয়ে দৌড়ায় না, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। তার দৌড়ে ছিল ক্ষুধা, তার খেলায় ছিল মুক্তির আনন্দ।

২০১৭ সাল আলফান্সোর জীবনে বিশেষ বছর। তিনি কানাডার নাগরিকত্ব পান এবং একই বছর জাতীয় দলের হয়ে অভিষেক করেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে কানাডার সিনিয়র জাতীয় দলে খেলা কোনো সাধারণ ঘটনা ছিল না। কনকাকাফ গোল্ড কাপে (CONCACAF Gold Cup) তিনি গোল করেন, আলোচনায় আসেন, কানাডা বুঝতে শুরু করে তাদের ফুটবলের নতুন প্রজন্মের মুখ হয়তো এই ছেলেটিই।

তারপর আসে ইউরোপের দরজা। জার্মানির মহাশক্তিধর ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখ তাঁকে দলে নেয়। কানাডার এক তরুণ, যার জন্ম শরণার্থী শিবিরে, সে গিয়ে দাঁড়াল ইউরোপীয় ফুটবলের সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ পরিবেশে। বায়ার্ন মিউনিখে গিয়ে আলফান্সো ডেভিস শুধু টিকে থাকেননি, নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর গতি, সাহসী দৌড়, আক্রমণে ওঠার ক্ষমতা এবং রক্ষণে ফিরে আসার শক্তি তাঁকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম আলোচিত লেফট-ব্যাক বানায়।

২০২০ সালে বায়ার্ন মিউনিখের সঙ্গে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের পথে তাঁর পারফরম্যান্স ফুটবল দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেয়। বড় মঞ্চে চাপ সামলানোর ক্ষমতা, প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস এবং নিজের বয়সের চেয়ে বেশি পরিণত খেলা তাঁকে বিশ্ব ফুটবলের আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

কিন্তু আলফান্সো ডেভিসের গল্প শুধু ক্লাব ফুটবলের নয়। কানাডার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আলাদা। যে দেশ তাঁর পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছিল, সেই দেশের জার্সি তাঁর কাছে শুধু পেশাগত দায়িত্ব নয়, এক ধরনের কৃতজ্ঞতার ভাষা। ২০২২ সালে কানাডা দীর্ঘ ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরেছিল। কাতার বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আলফান্সো ডেভিস গোল করেন। সেটি ছিল পুরুষদের বিশ্বকাপে কানাডার প্রথম গোল। ম্যাচটি কানাডা জিততে পারেনি, কিন্তু সেই গোল ইতিহাসে থেকে যায়।

২০২৪ সালের জুনে আলফান্সো ডেভিস কানাডা জাতীয় দলের অধিনায়ক হন। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তিনি কানাডা স্কোয়াডে অধিনায়ক হিসেবেই আছেন। এবার কানাডা নিজেই বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর সঙ্গে কানাডার মাটিতেও বিশ্বকাপ হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আলফান্সো ডেভিসের গল্প আরও বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। কারণ তিনি শুধু একজন তারকা ফুটবলার নন, কানাডিয়ান ফুটবলের বিবর্তনেরও এক প্রতীক। একসময় কানাডা ফুটবলে বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হতো না। আজ সেই কানাডা বিশ্বকাপ আয়োজন করছে, আর সেই দলের অন্যতম মুখ একজন ফুটবলার, যার জন্ম হয়েছিল শরণার্থী শিবিরে।

আজ যখন তিনি কানাডার জার্সি পরে মাঠে দাঁড়ান, তখন তাঁর পায়ের নিচে শুধু সবুজ ঘাস থাকে না। থাকে ঘানার শরণার্থী শিবিরের ধুলা, লাইবেরিয়ার যুদ্ধ থেকে পালানো পরিবারের স্মৃতি, এডমন্টনের ঠান্ডা সকাল, ভ্যাঙ্কুভারের একাডেমির ঘাম, মিউনিখের কঠিন প্রশিক্ষণ, আর কানাডার মানুষের প্রত্যাশা। তাঁর প্রতিটি দৌড় যেন বলে, মানুষের শুরু কোথায়, সেটি শেষ কথা নয়। মানুষ কোথায় পৌঁছাতে চায়, সেটিই শেষ পর্যন্ত তার পরিচয় গড়ে দেয়।

তথ্যসূত্র:
Canada Soccer, FIFA, UNHCR, Reuters ও সংশ্লিষ্ট ক্লাবের প্রকাশিত তথ্য।


Back to top button
🌐 Read in Your Language