সম্পাদকের পাতা

লন্ডনে চতুর্থবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হলেন কুলাউড়ার সাবিনা আক্তার

নজরুল মিন্টো

লন্ডনের পূর্ব প্রান্তে টাওয়ার হ্যামলেটস শুধু একটি স্থানীয় প্রশাসনিক এলাকা নয়। এটি ব্রিটিশ বাংলাদেশি জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে অভিবাসনের ইতিহাস আছে, সংগ্রামের স্মৃতি আছে, ভাষা, সংস্কৃতি, ব্যবসা, রাজনীতি এবং কমিউনিটির আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ পথচলা আছে। এই জনপদে রাজনীতি কেবল ব্যালটের অঙ্ক নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রয়োজনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

এই সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মাঝেই আবারও আলোচনায় এসেছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউন্সিলর সাবিনা আক্তার। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল নির্বাচনে স্টেপনি গ্রিন ওয়ার্ড থেকে টানা চতুর্থবারের মতো কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক, জনসেবার ধারাবাহিকতা এবং ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় শক্তি।

২০২৬ সালের টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল নির্বাচনে সাবিনা আক্তার অ্যাসপায়ার পার্টির প্রার্থী হিসেবে স্টেপনি গ্রিন ওয়ার্ডে ১ হাজার ৯৪০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। একই ওয়ার্ডে তাঁর সহপ্রার্থী আবদুল ওয়াহিদ আলীও বিজয়ী হন। প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রিন পার্টি ও লেবার পার্টির প্রার্থীরা ভোটের হিসাবে তাঁদের চেয়ে অনেক পেছনে ছিলেন। এই ব্যবধান শুধু একটি নির্বাচনী জয় নয়, বরং স্থানীয় ভোটারদের আস্থার একটি দৃঢ় প্রতিফলন।

সাবিনা আক্তারের রাজনৈতিক পথচলা দীর্ঘদিনের। ২০১৪ সালে তিনি লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে স্টেপনি গ্রিনে নির্বাচনে অংশ নেন। পরে ২০১৫ সালের উপনির্বাচনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৮ ও ২০২২ সালে তিনি লেবার পার্টির প্রার্থী হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। ২০২৬ সালে অ্যাসপায়ার পার্টির প্রার্থী হিসেবে তাঁর বিজয় রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

তাঁর পরিচয়ের আরেকটি ঐতিহাসিক দিক হলো, তিনি টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্থানীয় রাজনীতিতে একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারীর এমন অবস্থান শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, ব্রিটিশ বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্যও ছিল গর্বের একটি মুহূর্ত।

রাজনৈতিকভাবে সাবিনা আক্তারের জীবনে বড় মোড় আসে ২০২৪ সালের ২৬ জুন। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক লেবার পার্টির সঙ্গে যুক্ত থাকার পর তিনি দলটি থেকে পদত্যাগ করেন। ওই সময় তিনি টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার গ্রুপের ডেপুটি লিডার ছিলেন। আন্তর্জাতিক মানবিক ইস্যু এবং স্থানীয় কমিউনিটির স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দলের অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি অ্যাসপায়ার পার্টিতে যোগ দেন। দল পরিবর্তনের পরও স্টেপনি গ্রিনের ভোটাররা তাঁকে বিপুল সমর্থন দিয়েছেন।

এই জয় আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০২৬ সালের নির্বাচনে টাওয়ার হ্যামলেটসে অ্যাসপায়ার পার্টি বড় সাফল্য পায়। দলটি কাউন্সিলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে এবং লুৎফুর রহমান মেয়র হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হন। এই রাজনৈতিক জোয়ারের মধ্যেও সাবিনা আক্তারের ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক ও গ্রহণযোগ্যতা বিশেষভাবে লক্ষণীয় হয়ে ওঠে।

বর্তমানে সাবিনা আক্তার টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের Cabinet Member for Health, Wellbeing and Social Care হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। স্বাস্থ্য, জনকল্যাণ ও প্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর দায়িত্ব স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

সাবিনা আক্তারের শিকড় বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নের মাধবপুর ওসমানপুর গ্রামে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিনি সমাজসেবক ফারুক উদ্দিন সুন্দরের কন্যা। লন্ডনে স্থায়ী রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচিতি গড়ে তুললেও নিজের পৈতৃক এলাকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট রয়েছে।

একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নারী হিসেবে সাবিনা আক্তারের ধারাবাহিক সাফল্য বিশেষভাবে অনুপ্রেরণামূলক। ব্রিটিশ মূলধারার রাজনীতিতে নারী, অভিবাসী পটভূমি এবং সংখ্যালঘু পরিচয়ের প্রতিনিধিদের অনেক সময় দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়। সেই বাস্তবতায় টানা চারবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া এবং ক্যাবিনেট দায়িত্ব পালন করা তাঁর নেতৃত্ব, ধৈর্য, সংগঠনক্ষমতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় বহন করে।

তথ্যসূত্র:
Tower Hamlets Council, ২০২৬
The Guardian, ৯ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language