মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উড়িয়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের সাথে বৈঠকে ইউরোপের দেশগুলো

তেহরান, ১৭ মে – বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম লাইফলাইন ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় এসেছে। আমেরিকার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই এই নৌপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সচল রাখতে ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)-এর নৌবাহিনীর সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসেছে ইউরোপীয় দেশগুলো। শনিবার (১৬ মে) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশ্বজুড়ে সমুদ্রপথে যত অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি বাণিজ্য হয়, তার প্রায় এক-চতুর্থাংশ (২৫%) সম্পন্ন হয় এই সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে তেহরানের বিশেষ তত্ত্বাবধানে একটি ‘ট্রানজিট ব্যবস্থা’ চালু করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার আওতায় ইতিমধ্যেই পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ হরমুজ ও লারাক দ্বীপের দক্ষিণ রুট দিয়ে নিরাপদে এই প্রণালি পার হতে পেরেছে। এই সাফল্যের পরই ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের সাথে এই বিশেষ আলোচনায় অংশ নিয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখা এবং একই সাথে ইরানের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার জন্য একটি অত্যন্ত ‘পেশাদার পদ্ধতি’ বা রুট চালুর প্রস্তুতি নিয়েছে তেহরান।
তবে এই ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে কিছু কড়া শর্ত:
- কারা সুবিধা পাবে: এই প্রস্তাবিত নৌপথ কেবল সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ এবং ‘ইরানের সঙ্গে সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক’ রাখা পক্ষগুলোর জন্যই উন্মুক্ত থাকবে।
- ফি বা শুল্ক আদায়: এই বিশেষায়িত সামুদ্রিক রুটের নিরাপত্তা ও পরিষেবার জন্য তেহরান নির্দিষ্ট হারে ফি বা শুল্ক আদায় করবে।
- আমেরিকার জন্য নো-এন্ট্রি: যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘ফ্রিডম প্রজেক্ট’ বা পারস্য উপসাগরে মার্কিন নৌ অভিযানের সঙ্গে জড়িত কোনো অপারেটর বা জাহাজ এই রুট ব্যবহার করতে পারবে না। তাদের জন্য এই পথ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে।
মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলার জবাবে গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ দিয়ে মার্কিন ও ইসরায়েলি জাহাজ চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে ইরান। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ওয়াশিংটনও ইরানি বন্দরের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়।
তেহরানের সাফ কথা—ওয়াশিংটন যতক্ষণ না হরমুজ প্রণালি থেকে তাদের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করছে এবং ইরানের অবরুদ্ধ তহবিল ও নিষেধাজ্ঞা শিথিল করছে, ততক্ষণ মার্কিনদের জন্য এই পথ খুলবে না।
পর্দার আড়ালে এক বড় সমঝোতায় পৌঁছেছে দুই পক্ষ। পারমাণবিক আলোচনার মূল ইস্যু (ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত) আপাতত একপাশে সরিয়ে রেখে, দুই পক্ষই এখন হরমুজ নৌপথ সচল করা এবং মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইউরোপের এই পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধাক্কা বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, পারস্য উপসাগরের এই স্নায়ুযুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কার জয় হয়।
এনএন/ ১৭ মে ২০২৬









