অপরাধীর কোনো দল নেই! পুলিশকে কড়া বার্তা প্রধানমন্ত্রীর; ফাঁস করলেন পাহাড় সমান দুর্নীতি

ঢাকা, ১১ মে – এক নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নজিরবিহীন কঠোর বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (১১ মে) সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে ‘পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক বা তার রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। একইসাথে বিগত সরকারের আমলে হওয়া মেগা প্রকল্পগুলোর ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, কীভাবে জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, “আপনারা আইনের লোক, কোনো বিশেষ দলের নন। কারো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবশালী অবস্থান দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে থেমে গেলে চলবে না। যে অপরাধী, তাকে অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।”
তিনি আরও সতর্ক করে বলেন যে, প্রশাসনের কোনো পদই চিরস্থায়ী নয়। বদলি বা পদোন্নতির জন্য ‘তদবির’ করাকে তিনি পেশাদারিত্বের পরিপন্থী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, নিয়োগ ও বদলির একমাত্র মাপকাঠি হবে সততা, মেধা ও দক্ষতা।
বালিশ কাণ্ড থেকে ৫শ কোটি টাকার গাছ: দুর্নীতির খতিয়ান
বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বিগত দেড় দশকের ‘ফ্যাসিবাদী শাসনের’ ফলে সৃষ্ট ভঙ্গুর অর্থনীতির চিত্র তুলে ধরেন। অডিটর জেনারেলের প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন:
রূপপুর প্রকল্প: পাশের দেশে একই প্রকল্প ১৪ হাজার কোটি টাকায় শেষ হলেও বাংলাদেশে খরচ দেখানো হয়েছে ৯৬ হাজার কোটি টাকা। একটি বালিশের দাম ধরা হয়েছে ৮০ হাজার টাকা! ৩০ হাজার টাকার ড্রেসিং টেবিলের দাম দেখানো হয়েছে ৪-৫ লাখ টাকা।
কর্ণফুলী টানেল: টানেলের দুপাশে গাছ লাগানোর নামে কোনো কাজ ছাড়াই ৫০ কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় লাক্সারি অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে নষ্ট করা হয়েছে শত শত কোটি টাকা।
পিরোজপুর কেলেঙ্কারি: এলজিআরডি মন্ত্রণালয় থেকে কাজ না করেই কাগজ দেখিয়ে এক জেলাতেই প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার হদিস নেই।
প্রধানমন্ত্রী আক্ষেপ করে বলেন, “এই ঋণের বোঝা ২০ কোটি মানুষের ওপর। এই টাকাগুলো থাকলে আজ পুলিশের আবাসন ও আইটি খাতের সব দাবি মুহূর্তেই পূরণ করা যেত।”
মিতব্যয়িতার ডাক: মন্ত্রীদের তেল বরাদ্দ কমছে
প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “ক্যাবিনেটে সিদ্ধান্ত হয়েছে মন্ত্রীদের জ্বালানি তেলের বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ার। আমরা একটু ছাড় দিলে রাষ্ট্র অনেক বড় সাশ্রয় করতে পারবে।” তিনি পুলিশকে ‘সরকারের আয়না’ হিসেবে অভিহিত করে জনগণের সাথে মানবিক আচরণের নির্দেশ দেন।
জুলাই সনদের অঙ্গীকার ও ২০২৬-এর স্লোগান
২০২৪-এর ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতি পুলিশ যেভাবে সামলেছে তার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। এবারের পুলিশ সপ্তাহের স্লোগান ‘আমার পুলিশ, আমার দেশ; সবার আগে বাংলাদেশ’ সার্থক করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য একদিকে যেমন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতার বার্তা দিয়েছে, অন্যদিকে বিগত সরকারের দুর্নীতির শ্বেতপত্র জনসমক্ষে এনে এক নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।
এনএন/ ১১ মে ২০২৬









