অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে বাজেট প্রণয়নের চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

ঢাকা, ৪ এপ্রিল – বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি অনিবার্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলারের তীব্র সংকট রয়েছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তিকে অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে। ঠিক এমন এক কঠিন সময়ে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। মার্কিন, ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের ফলে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে এবং প্রবাস আয়ের প্রবাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিসহ মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো সংঘাতের কবলে পড়ায় জ্বালানি আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের পরিবহন খাত এবং শিল্প উৎপাদনে। লোডশেডিং ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাতগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় নিজেদের সক্ষমতা হারাচ্ছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট প্রণয়ন করা সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন এক চ্যালেঞ্জ। চলতি অর্থবছরে বাজেটের আকার প্রায় আট লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে অর্থবছরের প্রথম আট মাসে রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে এই ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আগামী বাজেটের আকার এবার আট লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আকার বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো এখানে আয় ও ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। ফলে তহবিল সংস্থানে সরকার কর বাড়াতে পারে অথবা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আরও বেশি হারে আয় করার পরিকল্পনা করতে পারে।
এর ফলে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাস্তবতা হলো বর্তমানে বেশির ভাগ ব্যবসায়ী তাঁদের উৎপাদন সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছেন। এতে তাঁদের মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এর ফলে ব্যক্তি কর, করপোরেট কর, আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়ছে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি বিদ্যমান অবস্থা চলতে থাকলে আগামী অর্থবছরেও কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় করা বেশ কঠিন হবে। বড় বাজেটের বিশাল খরচ মেটাতে গিয়ে সরকার যদি পুনরায় সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে দেয় তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
মানুষের প্রকৃত আয় না বাড়ায় তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এই অবস্থায় পরোক্ষ কর বা ভ্যাট বৃদ্ধি করলে তা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে যা সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। বাজেটের ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকারের সামনে প্রধান উৎস হলো অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা ও বিদেশি ঋণ। তবে বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণের সুদহার আইএমএফের শর্তানুযায়ী বাজারভিত্তিক করায় তা ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠে গেছে। উচ্চ সুদহারের কারণে বিনিয়োগে এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে। উচ্চ উৎপাদন খরচ এবং চড়া সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ায় ব্যবসায়ীরা নতুন করে ঋণ নিতে সাহস পাচ্ছেন না।
বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সুদহার কমানো উচিত হলেও বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করতে হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের এই দ্বন্দ্বে সুদহার দ্রুত কমানোর সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বিশেষ ছাড় বা পুনরর্থায়ন স্কিম বাজেটে রাখা অত্যন্ত জরুরি। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। তবে অর্থের সংস্থান করতে গিয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় কমানো না হলে এর দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপরই পড়বে।
রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নতুন করদাতা খোঁজা এবং কর ফাঁকি রোধে জোর না দিয়ে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ দেওয়া হলে তা ব্যবসাবাণিজ্যকে আরও সংকুচিত করবে। তাই আগামী বাজেটে রাজস্ব আদায়ের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ব্যয় সংকোচনে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো স্থগিত রেখে সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষি ভর্তুকিতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের ঘুরে দাঁড়াতে হলে আসন্ন বাজেটে এমন একটি কর ও শুল্ক নীতি প্রয়োজন যা কেবল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করবে না বরং শিল্প উৎপাদন ও বিনিয়োগকে সুরক্ষা দেবে।
শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিতে আগাম কর এবং অগ্রিম আয়কর ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচামাল আমদানির ওপর অগ্রিম করহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো গেলে ব্যবসায়ীদের হাতে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়বে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক রেয়াত আরও সহজতর করা উচিত। করপোরেট করের ক্ষেত্রেও একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থিতিশীল কাঠামো প্রয়োজন।
তালিকাভুক্ত ও অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহারে ছাড় দেওয়া এবং কর প্রদানের প্রক্রিয়া পুরোপুরি ডিজিটাল করা জরুরি। কর অবকাশ সুবিধা হুট করে তুলে না দিয়ে পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনা যুক্তিসংগত। একইসঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা অনেকটা বাড়িয়ে দেওয়া উচিত। সামগ্রিকভাবে করের আওতা সম্প্রসারিত করা এবং একটি স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমেই সরকার এই সংকট মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।
এস এম/ ৪ এপ্রিল ২০২৬









