আকাশসীমা নিষেধাজ্ঞায় চরম সংকটে ভারতীয় বিমান সংস্থা, বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি

মধ্যপ্রাচ্য, ১১ মার্চ – ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় নিষেধাজ্ঞা ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য একটি বড় সংকট তৈরি করেছে।
গত বছর পাকিস্তান তাদের আকাশসীমায় ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করার পর থেকে এই অঞ্চলটি ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাতায়াতের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ফ্লাইটের সময়সূচি এবং রুট পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছে সংস্থাগুলো।
পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ না থাকায় ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর সামনে বিকল্প পথ এখন খুবই সীমিত। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী ভারতের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া এবং ইন্ডিগো গত দশ দিনে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকাগামী তাদের নির্ধারিত এক হাজার দুইশো ত্রিশটি ফ্লাইটের মধ্যে প্রায় চৌষট্টি শতাংশই পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ অমিত মিত্তালের মতে এটি আন্তর্জাতিক রুটে চলাচলকারী ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর জন্য দ্বিগুণ ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনার জেরে গত এপ্রিল থেকে পাকিস্তান ভারতীয় বিমান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। এদিকে ব্রিটিশ বহুজাতিক ব্যাংকিং এবং আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি জানিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলোর খরচ ও মুনাফার ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ব্যাংকটির ধারণা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে টানা সাত দিন ফ্লাইট বাতিল থাকলে বিমান সংস্থাগুলোর বার্ষিক কর পূর্ববর্তী মুনাফার পূর্বাভাস প্রায় এক দশমিক দুই শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। ইন্ডিগো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে শেষ মুহূর্তে আরোপিত আকাশসীমা বিধিনিষেধের কারণে তাদের একটি বিমান প্রায় তেরো ঘণ্টা আকাশে ওড়ার পর শেষ পর্যন্ত দিল্লিতে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।
এছাড়া লন্ডন থেকে মুম্বাইগামী ইন্ডিগোর অপর একটি বোয়িং বিমানও আফ্রিকার ইরিত্রিয়ার আকাশসীমায় একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং সোমবার সেটিকে কায়রোতে ঘুরিয়ে নেওয়া হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে ফ্লাইট চলাচলে এই বিঘ্ন ইন্ডিগোর সংকটকে আরও তীব্র করেছে। এর মধ্যেই কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিটার এলবার্স মঙ্গলবার পদত্যাগ করেছেন। গত ডিসেম্বরে একটি অপারেশনাল সংকটের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ব্যাপক তদন্তের মুখে পড়তে হয়েছিল।
এ বিষয়ে রয়টার্সের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলেও ইন্ডিগো ও এয়ার ইন্ডিয়া কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে সোমবার এয়ার ইন্ডিয়া জানায় ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের মধ্যে বাড়তি চাহিদার কারণে আগামী সপ্তাহে ভারত, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রুটে তারা অতিরিক্ত আটাত্তরটি ফ্লাইট পরিচালনা করবে।
তবে কিছু গন্তব্যে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত যাত্রাবিরতি নেওয়ায় তাদের ফ্লাইটের সময় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে ভারত থেকে আসা যাওয়ার রুটে লুফথানসা ও আমেরিকান এয়ারলাইন্সের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থাগুলোর তুলনায় তারা বেশ পিছিয়ে পড়ছে। ফ্লাইডর্যাডার চব্বিশের তথ্য অনুসারে সোমবার এয়ার ইন্ডিয়ার দিল্লি থেকে নিউ ইয়র্কগামী ফ্লাইটটি রোমে যাত্রাবিরতি নেওয়ায় যাত্রার সময় প্রায় বাইশ ঘন্টা বেড়ে যায়। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে এয়ার ইন্ডিয়া ইরাক এবং তুরস্ক হয়ে কোনো যাত্রাবিরতি ছাড়াই প্রায় সতেরো ঘন্টায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে সক্ষম ছিল।
তুলনামূলকভাবে রবিবার আমেরিকান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট একই রুটে পাকিস্তান হয়ে প্রায় ষোলো ঘন্টা সময় নিয়েছিল। টাটা গ্রুপ ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের যৌথ মালিকানাধীন এয়ার ইন্ডিয়া রয়টার্সকে জানিয়েছে পাকিস্তানের আকাশসীমা নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের বছরে প্রায় ছয়শো মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হতে পারে।
ভারত সরকার ২০২২ সালে বিমান সংস্থাটিকে বেসরকারি খাতে বিক্রি করে দেওয়ার পর গত বছর এয়ার ইন্ডিয়া চারশো তেত্রিশ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
দীর্ঘ ফ্লাইট সময়ের কারণে জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিমান সংস্থার সামগ্রিক খরচ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে মার্কিন ও ইসরায়েলি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এই জ্বালানি খরচ আরও আশঙ্কাজনক হারে বাড়তে পারে।
এ এম/ ১১ মার্চ ২০২৬









