
ইতালির উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত লোম্বার্দি অঞ্চলের রাজধানী মিলান। এ যেন ইউরোপের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা আধুনিকতার এক অপূর্ব নিদর্শন। বস্ত্রশিল্প, ডিজাইন, শিল্পকলার জন্য বিখ্যাত এই শহরটি যতটা ঝলমলে, ততটাই জটিল এক সামাজিক টানাপোড়েনেরও আবাসভূমি। ফ্যাশন ও শিল্পের শহর মিলান, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে হাজারো অভিবাসীর অবর্ণনীয় সংগ্রাম।
এই শহরের বুকেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশি অভিবাসীদের এক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। মূলত মাদারিপুর, শরিয়তপুর, নোয়াখালী ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে আসা অভিবাসীরা এখানে কাজ করেন বিভিন্ন কারখানা, রেঁস্তোরা, কেয়ারহোম কিংবা নির্মাণস্থলে। শহরতলির পুরনো এপার্টমেন্টগুলোর ব্যালকনিতে দেখা যায় শাড়ি-কামিজ, গামছা-লুঙ্গি ঝুলছে। দেখেই বুঝা যায় এখানে বাঙালিরা বসবাস করে।
শামিমা আক্তার। ৩২ বছর বয়সী এক নারী, যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন একটি স্বাধীন জীবনের, নিজের পরিচয়ে দাঁড়ানোর। বাংলাদেশের মাদারীপুর জেলার কালকিনিতে জন্ম নেয়া এই তরুণী এইচএসসি পাস করে ২০২০ সালে বিয়ে করে চলে আসেন ইতালির মিলানে। তার স্বামী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের বাড়িও মাদারীপুর, তিনি একজন জুতা ফ্যাক্টরির শ্রমিক। তবে শুধু বৈধ কাগজপত্রের অভাব নয়, রফিকুল ছিলেন এক গভীর মানসিক অস্থিরতা ও নিয়ন্ত্রণকামী মনোভাবের অধিকারী; যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল।
শামিমা ইতালির Scuola Leonardo da Vinci ভাষা স্কুলে ইতালিয়ান ভাষা শেখার ক্লাসে ভর্তি হন ২০২২ সালে। তাঁর লক্ষ্য ছিল A2 লেভেল শেষ করে চাকরি পাওয়া, এবং আত্মনির্ভরশীল হয়ে ওঠা। কিন্তু এই চেষ্টাই তার স্বামীর জন্য রূপ নেয় এক অন্ধ ঈর্ষার আগুনে।
প্রতিদিনের কলহ, হুমকি, নির্যাতনের মধ্যে থেকেও শামিমা স্বপ্ন দেখতেন, তিনি ইতালিয়ান ভাষায় কথা বলবেন, একদিন কোনো একটি দোকানে সেলসগার্ল হিসেবে কাজ করবেন। কিন্তু শামিমার স্বামী রফিকুল ইতিমধ্যেই তাকে নজরদারির ভেতর রেখেছিল। প্রতিদিনের চলাফেরা খতিয়ে দেখত সে।
২০২৩ সালের ১৫ জুন ছিল সেই ভয়াবহ দিন। দুপুরে শামিমা প্রতিদিনের মতো তার ভাষা স্কুলে যান, আর বিকেলে ফিরে এসে দেখেন ১৭টি মিসড কল। বাসায় ফিরে নিয়মিত যে কাজগুলো করে থাকেন সেগুলোই তিনি করছিলেন। সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে, রফিকুল অকস্মাৎ রান্নাঘরের গ্যাস সিলিন্ডার থেকে গ্যাসোলিন ছড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেন, এবং অ্যাপার্টমেন্টের দরজা বাইরে থেকে তালা দিয়ে আটকে দেন শামিমাকে।
শামিমা শেষবারের মতো চিৎকার করেছিলেন: “বাঁচাও!” তাঁর কণ্ঠ ভেসে এসেছিল জানালার ফাঁক গলে। প্রতিবেশী লুকা ফেরারি শুনেছিলেন সেই করুণ আর্তনাদ: “আমাকে বাঁচাও! দরজা খোল!” কিন্তু তালা ভাঙতে ভাঙতে চারপাশ ধোঁয়ার অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসা সেই ধোঁয়া যেন মিলানের নীল আকাশে একটি অপরাধের অমোচনীয় ছাপ রেখে দিয়েছিল।
ফায়ার ব্রিগেড এসে শামিমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তিনি ৮০ শতাংশ দগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তিন দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ১৮ জুন, চিরতরে নিথর হয়ে যান।
ফরেনসিক তদন্তে উঠে আসে, আগুনে ব্যবহৃত গ্যাসে কেমিক্যাল অ্যাক্সিলারেন্ট মেশানো ছিল—যা অতি দ্রুত আগুন ছড়ায়।
আদালতের বিচারে রফিকুলকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর আদালত তাকে আজীবন কারাদণ্ড দেন, এবং শামিমার পরিবারকে ২ লক্ষ ইউরো ক্ষতিপূরণ প্রদানের নির্দেশ দেন।
শামিমার মৃত্যুতে তার পরিবার বাংলাদেশে অনেকদিন যাবৎ শোকবিহ্বল অবস্থায় দিন কাটায়। তার মা জাহানারা বেগম দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ ঘটনার পর শামিমার ছোটো ভাই ইতালিতে আসেন এবং বর্তমানে স্থায়ীভাবে বসবাস করার অনুমতি পেয়েছেন। তিনি এখন মিলানের একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করছেন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই মামলার প্রভাবও ব্যাপক। আল জাজিরার ডকুমেন্টারি “Burned for Learning” পেয়েছে বছরের সেরা ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম অ্যাওয়ার্ড।
শামিমার মৃত্যুর ৩ সপ্তাহ আগে রফিকুল ৫০,০০০ ইউরোর লাইফ ইন্স্যুরেন্স করেছিলেন (শামিমার নামে, নিজেকে বেনিফিশিয়ারি করে)। আদালত তার ইন্স্যুরেন্স ক্লেইম বাতিল করেছেন (হত্যার সাথে জড়িত প্রমাণিত হওয়ায়)। টাকা শামিমার পরিবারকে দেওয়ার আদেশ হয়েছে।









