
ইতালির উত্তর-পূর্ব প্রান্তে আড্রিয়াটিক সাগরের কোলে ভেসে থাকা এক অপূর্ব স্বপ্নলোকের নাম ভেনিস। শহরটিকে বলা হয় লা সেরেনিসিমা, অর্থাৎ “সবচেয়ে শান্ত”, যদিও বাস্তবে এটি এক প্রাণচঞ্চল ও রঙিন নগরী। একশোরও বেশি ছোট ছোট দ্বীপকে শত শত সেতুর মাধ্যমে জোড়া দিয়ে তৈরি হয়েছে এই শহর। গলি-ঘুপচি আর খালপথের ভেনিস যেন জলের ওপর ভেসে থাকা এক শিল্পকর্ম। ভ্রমণকারীর কাছে ভেনিস শুধুই পর্যটন নয়, এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, প্রেম আর অভিবাসনের এক মিলনমেলা।
বাংলাদেশ থেকেও হাজারো মানুষ ভাগ্যান্বেষণে ভেনিসে এসে থিতু হয়েছে। আজ প্রায় ৪০ হাজার বাংলাদেশি এই ক্ষুদ্র শহরে বসবাস করছে। কেউ রেস্তোরাঁ, কেউ দোকানপাট, আবার কেউ পর্যটন ব্যবসার সাথে যুক্ত হয়ে নিজেদের জীবন গুছিয়ে নিয়েছে। ভেনিসের বাজারে, রিয়ালতো ব্রিজের কাছে কিংবা ছোট্ট কোনো খালঘেঁষা ক্যাফেতে দাঁড়ালে খুব সহজেই বাংলা ভাষার শব্দ কানে ভেসে আসে। একদিকে ভেনিসের চিরচেনা ইতালীয় সৌন্দর্য, অন্যদিকে বাঙালি জীবনের ছোঁয়া, দুটো মিলেমিশে এক ভিন্ন আবহ তৈরি করেছে।

গত বৃহষ্পতিবার প্যারিস থেকে ইজিজেট (easyJet) এয়ারলাইন্সে আমরা রওয়ানা দিই ভেনিসের উদ্দেশে। আজকাল বিমান কোম্পানিগুলোর কৌশল দেখে অবাক হই। অনলাইনে ভাড়া দেখাবে খুব সস্তা, তারপর কিভাবে যাত্রীর কাছ থেকে পয়সা খসাতে হয় সে কায়দা তারা জানে। প্রথমে লাগেজের জন্য এক্সট্রা পয়সা, এরপর ক্যরিঅন, হ্যান্ডব্যাগ, সিট নির্বাচন, স্পিডি বোর্ডিং ইত্যাদি। সব কৌশলের মোকাবিলা করে অবশেষে আমরা ভেনিসের মার্কোপোলো বিমানবন্দরে এসে পৌঁছাই। আমাদের স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে আসেন ইমরাতুল জান্নাত পুষ্প।
পুষ্পের শৈশব-কৈশোর কেটেছে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে। এনজিএফএফ স্কুলের শিক্ষার্থী থাকার সুবাদে তার সাথে আমার সফরসঙ্গী মুনির ভাইয়ের পরিচয় ও যোগাযোগ তৈরি হয়। সেই সম্পর্কের সূত্রেই আমন্ত্রণ পাই।

গত কয়েকদিন ধরে পুষ্প ও সেলিম আহমেদ পরিবার আমাদের যেভাবে আদর-যত্ন আর আপ্যায়ন করেছেন, তার বিস্তারিত তালিকা করলে তা হবে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর। খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাঘুরি, রাতের আড্ডা—সবকিছুতেই ছিল তাদের আন্তরিক সেবা ও নিরন্তর যত্ন। শুধু ভ্রমণেই নয়, তারা আমাদেরকে স্থানীয় সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা ও অভিবাসী অভিজ্ঞতার সাথেও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন।
ভেনিস ভ্রমণের শুরুতেই যেটি চোখে পড়ে, সেটি হলো সেন্ট মার্ক’স স্কয়ার। এটি ভেনিসের প্রাণকেন্দ্র, যেন শহরের হৃদস্পন্দন। বিশাল খোলা প্রাঙ্গণ, চারপাশে ঐতিহাসিক প্রাসাদ, ঘণ্টাঘর আর অসংখ্য কবুতর মিলিয়ে এক স্বপ্নময় পরিবেশ তৈরি করে। ভ্রমণকারীরা এখানে বসে কফি পান করতে করতে শহরের ছন্দ অনুভব করেন। এখানেই বাংলাদেশি অভিবাসীদের ছোট ছোট দোকান চোখে পড়ে। এসব দোকানে স্যুভেনির থেকে শুরু করে নানা ধরনের সামগ্রী পাওয়া যায়।

স্কয়ারের এক কোণেই দাঁড়িয়ে আছে গৌরবোজ্জ্বল সেন্ট মার্ক’স বাসিলিকা। বাইজান্টাইন স্থাপত্যে নির্মিত এই গির্জা সোনালি মোজাইক আর খুঁটিনাটি নকশার জন্য বিশ্বজোড়া খ্যাতি পেয়েছে। ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো যেন ইতিহাসের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। প্রতিটি স্তম্ভ আর ছবির পেছনে আছে শতাব্দীর গল্প। অনেকে বলে, ভেনিসের আত্মা এই বাসিলিকাতেই বাস করে।
ভেনিসের শাসকদের পুরনো প্রাসাদ ডোজ’স প্যালেস হলো শক্তি ও শিল্পের অনন্য প্রতীক। সাদা মার্বেল আর গথিক নকশায় তৈরি এই প্রাসাদের আদালতঘর, গোপন সিঁড়ি, আর্ট গ্যালারি, সবকিছুতেই আছে রাজকীয় আবহ। এখানেই দেখা যায় বিখ্যাত ব্রিজ অফ সাইস (Bridge of Sighs), যেটি জেলখানার সাথে প্রাসাদকে যুক্ত করেছে। বন্দিরা শেষবারের মতো মুক্ত ভেনিসের আকাশ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। সেই থেকেই নামকরণ।

ভেনিস মানেই খাল, আর খালের রাজা হলো গ্র্যান্ড ক্যানাল। শহরটিকে আড়াআড়িভাবে কেটে যাওয়া এই প্রধান জলপথের দুই পাশে সারি সারি প্রাসাদ, চার্চ আর ঐতিহাসিক ভবন। ভাপোরেত্তো বা ওয়াটার বাসে চড়ে যখন ক্যানালের বুকে ছুটে চললাম, তখন বুঝলাম কেন ভেনিসকে জলের শহর বলা হয়। সূর্যাস্তের সময় নৌকা ভ্রমণের রোমাঞ্চ একেবারেই অনন্য।
গ্র্যান্ড ক্যানালের সবচেয়ে বিখ্যাত সেতু হলো রিয়ালতো ব্রিজ। এটি শুধু স্থাপত্যের জন্য নয়, বাণিজ্যের ইতিহাসের জন্যও বিখ্যাত। একসময় এখানে ছিল ভেনিসের প্রধান বাজার, আর আজও কাছাকাছি এলাকায় জমজমাট রঙিন বাজার বসে। বাজারে গিয়ে তো অবাক হবার পালা। অধিকাংশ দোকানের মালিক বাংলাদেশি দেখে মন ভরে গেল।

ভেনিস থেকে এক ঘন্টার দূরত্বে (হাইস্পিড ট্রেনে) ইতালির আরেকটি বিখ্যাত শহর ভেরোনা। পাহাড় ও নদীর কোলে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন নগরী শুধু ইতালিরই নয়, সমগ্র ইউরোপের সংস্কৃতি ও রোমান্সের এক অনন্য প্রতীক। শহরে পা রাখতেই বোঝা যায়, ইতিহাস আর প্রেম এখানে হাতে হাত ধরে হাঁটে।
ভেরোনার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো রোমিও-জুলিয়েটের কাহিনি। উইলিয়াম শেকসপিয়রের অমর নাটক Romeo and Juliet-এর ঘটনাস্থল হিসেবে শহরটি বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেয়েছে। শহরের কেন্দ্রেই আছে কাসা দি জুলিয়েট (Casa di Giulietta) বা জুলিয়েটের বাড়ি। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করে। কেউ পুরনো পাথরের দেয়ালে লেখা প্রেমের বার্তা পড়তে আসে, কেউবা ভালোবাসার প্রতীকী তালা ঝুলিয়ে দিয়ে নিজের প্রেমকে অমর করে রাখতে চায়। আঙিনায় রয়েছে জুলিয়েটের বিখ্যাত ব্রোঞ্জের মূর্তি। প্রেমিক-প্রেমিকারা বিশ্বাস করেন, মূর্তির গায়ে হাত রাখলে ভালোবাসা চিরস্থায়ী হয়। সত্যি হোক বা কল্পনা, এই বিশ্বাসই ভেরোনার প্রেমের আবহকে আরও জাদুময় করে তোলে।

ভেরোনার প্রতিটি কোণ যেন একেকটি গল্প বলে। কখনো শেকসপিয়রের প্রেমকাহিনি, কখনো রোমান সাম্রাজ্যের গৌরব, কখনো আবার মধ্যযুগীয় বাণিজ্যের কোলাহল। আর সেই গল্প শুনতে প্রতিদিনই আসে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভ্রমণকারী।

ভেনিস সফরে এক মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা ছিল এনটিভির প্রতিনিধি নাজমুল হোসেন ও তরুণ ব্যবসায়ী আমান-এর সঙ্গে পরিচয়। আড্ডার ফাঁকে তারা আমাদের শোনালেন ভেনিসে অভিবাসী বাংলাদেশিদের নানা সাফল্যের গল্প।

ভেনিসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জীবন একেবারেই ভিন্ন ছন্দে চলে। পর্যটকনির্ভর এই শহরে তাদের কর্মজীবনও মূলত গড়ে উঠেছে ভ্রমণ ও সেবাখাতকে কেন্দ্র করে। কেউ ছোটখাটো স্মারক দোকান চালান, যেখানে ভেনিসের ঐতিহ্যবাহী মুখোশ, কাচের জিনিসপত্র কিংবা স্থানীয় হস্তশিল্প বিক্রি হয়। আবার কেউ রেস্তোরাঁ ও কফিশপে কাজ করে কিংবা নিজস্ব খাবারের দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেকেই বাইকে চড়ে ফুড ডেলিভারির মাধ্যমে শহরের প্রতিটি গলি ও খালে ছুটে বেড়ান, যেন ভেনিসের রক্তপ্রবাহে তারাই প্রাণসঞ্চার করছে। আরেকদল তরুণ-তরুণী পর্যটকদের কাছে নানা ধরনের সামগ্রী বিক্রি করেন হকার হিসেবে, যা একদিকে জীবিকার নিশ্চয়তা দেয়, অন্যদিকে ভেনিসের ব্যস্ত রাস্তাঘাটে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি দৃশ্যমান করে তোলে।

ভেনিসের জাহাজ শিল্পের পরিচয় বিশ্বব্যাপী। বিশাল বিশাল ক্রুজিং জাহাজ তৈরি হয় এ শহরেই। জেনে খুশি হলাম এ শিল্পে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় কুড়ি হাজার বাংলাদেশির।
অনেকেই এখন স্থায়ীভাবে পরিবার নিয়ে ভেনিসে থাকেন। লক্ষ্য করলাম, নব্বই ভাগ বাংলাদেশি বয়সে তরুন—যাদের বয়স ৩০ বছরের নিচে।

বাংলাদেশিরা তাদের পরিশ্রম, ধৈর্য আর ঐক্যের মাধ্যমে এ শহরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভেনিসে বাংলাদেশিদের দ্বিতীয় প্রজন্ম চলছে। এদের কেউ কেউ শিক্ষাজীবন শেষ করে ইতালির মূলধারার সমাজে জায়গা করে নিচ্ছে পেশাদার হিসেবে।

আজ ভেনিসে হাঁটতে হাঁটতে কোনো রেস্তোরাঁয় ঢুকলে বা বাংলাভাষায় ডাক শুনলে মনে হবে, এ যেন রোমান্টিক শহরের বুকে এক টুকরো বাংলাদেশ।









