সম্পাদকের পাতা

কোপেনহেগেনের এক বসন্ত বিকেল ও নাসরিন আক্তার

নজরুল মিন্টো

নাসরিনের কল্পিত ছবি

উত্তর ইউরোপের এক সুশৃঙ্খল, শান্ত, ছিমছাম নগরী ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন। ঝকঝকে রাস্তাঘাট, সাইকেল আর নৌকার শহর, যেখানে গ্রীষ্মের বিকেলে সূর্য ডুবে যায় ধীরে ধীরে, হরেক রঙের মানুষ হাঁটে পার্কে, হাতে কফির কাপ আর চোখে স্বপ্ন। ফ্যালেদপার্কেন উদ্যানের বুক চিরে ছুটে চলে বাচ্চাদের কোলাহল, প্রেমিক যুগলের নীরবতা, আর শীতের শেষে জেগে ওঠা জীবনের চিহ্ন। ঠিক এখানেই একদিন থেমে গিয়েছিল একটি প্রাণ, এক তরুণীর জীবন, যার গল্পটি হয়ে উঠেছে দেশটির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়।

ডেনমার্কের মাটি ও বাতাসে বেড়ে ওঠা এক মেয়ের নাম নাসরিন। তার পরিবার বাংলাদেশের মৌলভিবাজার জেলা থেকে ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে অভিবাসিত হয়। তারা কোপেনহেগেনের নোরেব্রো অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। এখানেই নাসরিনের জন্ম ১৯৯৩ সালে।

শুরুটা ছিল স্বপ্নের মতো। স্থানীয় ডেনিশ স্কুলে পড়াশোনা, খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে বেড়ে ওঠা। নাসরিন নোরেব্রো পার্ক স্কুলে, পরে কোপেনহেগেন ভোকেশনাল কলেজ থেকে হেলথ কেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে ডিপ্লোমা অর্জন করেন।

তার পেশাগত জীবন শুরু হয় একটি স্থানীয় ক্লিনিকে নার্সিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে। নাসরিন ছিলেন আত্মনির্ভর, আত্মবিশ্বাসী ও উজ্জ্বল একজন তরুণী। কিন্তু এই জীবন তার পরিবারের চোখে ছিল “অপসংস্কৃতির অনুকরণ”।

তার বাবা রহমত আলী স্থানীয় একটি সুপার মার্কেটের কর্মচারী ছিলেন। মা শিরিন আক্তার ছিলেন গৃহিণী। নাসরিনের ভাই মোহাম্মদ হোসেন, বয়স ২৫, তিনি ডেনিশ পাবলিক স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করেন, কিন্তু উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী ছিলেন না। ছিলেন বেকার ও চরমপন্থী মানসিকতার। তার বিশ্বাস ছিল, বোনের জীবনযাপন ‘পরিবারের সম্মান’ ও ‘ধর্মীয় আদর্শ’ রক্ষার পরিপন্থী।

২০১৯ সালের পর থেকে নাসরিনের সাথে পরিবারের সম্পর্ক চরম উত্তেজনার দিকে যায়। তাকে জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়, যা সে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে। সেই বছরই তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়। এরপর তিনি বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নেন কোপেনহেগেন উইমেন’স শেল্টারে।

সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা ছবিতে সে জিন্স পরিহিতা, হাসিমুখে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি যা তার ভাইয়ের জন্য ‘লজ্জা’র কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মোহাম্মদ হোসেন তার বন্ধুদের সঙ্গে এসব নিয়ে আলোচনা করতেন এবং ধীরে ধীরে গড়ে তুলছিলেন এক হিংস্র প্রতিশোধের পরিকল্পনা।

৭ মে ২০২১। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। মোহাম্মদ হোসেন ফোন করে নাসরিনকে বলে—চলো, পার্কে বসে কথা বলি, সব মিটমাট করে নিই। নাসরিন সন্দেহ করলেও শেষ পর্যন্ত রাজি হন।

সন্ধ্যা ৬:৩০টায় ফ্যালেদপার্কেন-এর এক নির্জন কোণে তারা দেখা করেন। সাক্ষীদের মতে, তারা উচ্চস্বরে তর্কে জড়িয়ে পড়েন।

৬:৪৫টায় মোহাম্মদ হোসেন একটি ছুরি বের করে হঠাৎ আক্রমণ করেন। ছুরিকাঘাত করেন বুকে, পেটে, পিঠে। একটি আঘাত সরাসরি তার হৃৎপিণ্ডে বিদ্ধ হয়। সে লুটিয়ে পড়ে রক্তাক্ত অবস্থায়। এক পথচারী তখন ১১২ নম্বরে কল করেন।

সন্ধ্যা ৭:৩০। অ্যাম্বুলেন্স আসে। মৃত্যুর আগে নাসরিন শুধু একটি বাক্য বলেন, “আমার ভাই…”

রাত ৮টার মধ্যে মোহাম্মদ হোসেন তার বাসা থেকে গ্রেফতার হন। জামায় রক্তের দাগ, হাতে ছুরির কাটা দাগ।

আদালতে হোসেন বলেন, “সে আমাদের ধর্ম ও সংস্কৃতি নষ্ট করেছিল… সে আর আমার বোন ছিল না। সে ছিল শয়তান।”

পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী, মোহাম্মদ হোসেন অনলাইন লেকচার (ইউটিউব, টেলিগ্রাম) এর মাধ্যমে সালাফি/ওয়াহাবি মতাদর্শে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি স্থানীয় হিজবুত তাহরীর-এর কিছু সদস্যের সাথে যোগাযোগ রাখতেন (ডেনিশ গোয়েন্দা রিপোর্ট, ২০২০)।

২০২২ সালে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় ডেনিশ কোর্ট। সাধারণত ডেনমার্কে যাবজ্জীবন মানে ১২-১৬ বছরে প্যারোল সম্ভব, কিন্তু আদালত এই মামলাকে ‘নৃশংস, পূর্বপরিকল্পিত এবং ঘৃণাপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করে সেই ছাড় প্রযোজ্য না করার রায় দেয়।

তথ্যসূত্র:

  • Berlingske (ডেনমার্কের প্রধান সংবাদপত্র: ৮ মে, ২০২১)
  • The Guardian (২২ এপ্রিল, ২০২২)
  • Politiken (ডেনমার্কের আরেকটি প্রধান সংবাদপত্র: ২৪ এপ্রিল, ২০২২)


Back to top button
🌐 Read in Your Language