সম্পাদকের পাতা

কূটনীতি ও রাজনীতিতে লিবারেল সরকারের নতুন সমীকরণ

নজরুল মিন্টো

সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিল ব্লেয়ার

কানাডার রাজনৈতিক অঙ্গনে কার্নি সরকারের একের পর এক চমক এখন সবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। অভিজ্ঞ মন্ত্রীদের কূটনৈতিক দায়িত্বে পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে সামনে আনার ইঙ্গিতও স্পষ্ট। সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি উভয় ক্ষেত্রেই কানাডা এক নতুন ধাপে প্রবেশ করছে।

প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি দায়িত্ব নেওয়ার পর মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তার মন্ত্রিসভা এবং দলের অভ্যন্তরে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ রদবদল ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে ট্রুডো-যুগের শীর্ষ মন্ত্রীদের কূটনৈতিক নিয়োগ এবং দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের অবসরে গিয়ে কূটনৈতিক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের রাজনীতিকদের মধ্যে আগ্রহও বাড়ছে, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে এক প্রকার প্রজন্মান্তরের। এই পরিবর্তনগুলো লিবারেল পার্টির অভ্যন্তরে নতুন ভারসাম্য তৈরি করছে।

প্রথমেই আসা যাক কূটনৈতিক নিয়োগ প্রসঙ্গে। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিল ব্লেয়ারকে যুক্তরাজ্যে কানাডার হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে। টরন্টো পুলিশের সাবেক প্রধান হিসেবে নিরাপত্তা বিষয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে ট্রুডো সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালে তিনি আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার, ন্যাটো সহযোগিতা ও জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সাবেক বিচারমন্ত্রী ডেভিড লামেত্তি

ট্রুডো সরকারের মাদক নীতি সংস্কার ও বন্দুক নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। এই অভিজ্ঞতা তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সাহায্য করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

যুক্তরাজ্যে কানাডার কূটনৈতিক সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রেক্সিট-পরবর্তী ইউরোপে কানাডা–যুক্তরাজ্য সম্পর্ক নতুন করে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে, আর সেখানে একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হিসেবে ব্লেয়ারের নিয়োগকে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জ্বালানি খাতের সাবেক মন্ত্রী জোনাথন উইলকিনসন

একইভাবে সাবেক বিচারমন্ত্রী ডেভিড লামেত্তির সম্ভাব্য জাতিসংঘে প্রেরণ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। লামেত্তি ছিলেন ট্রুডো সরকারের অধীনে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত কানাডার বিচারমন্ত্রী। তিনি অপরাধ আইন সংস্কার, কানাবিস বৈধকরণের পরবর্তী আইনগত কাঠামো এবং অনলাইন হেট স্পিচ আইনের খসড়া তৈরিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে পুনর্মিলন প্রক্রিয়া জোরদার করা এবং ন্যায়বিচার ব্যবস্থায় বৈচিত্র্য বাড়ানোর ক্ষেত্রেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য।

সম্প্রতি তিনি প্রধানমন্ত্রী কার্নির প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন, কিন্তু মাত্র দুই মাসের মাথায় তিনি যদি জাতিসংঘে রাষ্ট্রদূত হন, তাহলে এটি সরকারের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেবে এবং পাশাপাশি কানাডার কূটনৈতিক অবস্থানও আরও শক্তিশালী করবে।

জাতিসংঘে কানাডার ভূমিকা সবসময়ই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার, শান্তিরক্ষা ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। লামেত্তির আইনি অভিজ্ঞতা সেখানে কানাডাকে আরও শক্তিশালী অবস্থান নিতে সহায়তা করতে পারে।

সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বর্তমান পরিবহন মন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড

জ্বালানি খাতের সাবেক মন্ত্রী জোনাথন উইলকিনসনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে রাষ্ট্রদূত হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে তিনি ট্রুডো মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন, বিশেষ করে পরিবেশ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে। তার নেতৃত্বেই কানাডা জলবায়ু পরিবর্তন নীতি প্রণয়ন, প্যারিস চুক্তির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কার্বন ট্যাক্স কার্যকর করার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক মূলত বাণিজ্য ও জলবায়ু পরিবর্তন নীতিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। সিইটিএ (CETA) চুক্তি থেকে শুরু করে সবুজ জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতায় ইইউ কানাডার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। উইলকিনসন সেখানে নিয়োগ পেলে এই সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে এবং কানাডা জলবায়ু কূটনীতিতে বৈশ্বিক নেতৃত্ব জোরদার করতে পারবে।

এই নিয়োগগুলোর সমান্তরালে সাবেক অর্থমন্ত্রী ও উপ-প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড নতুন ভূমিকায় যাচ্ছেন। তিনি পরিবহন মন্ত্রীর পদ থেকে সরে গিয়ে ইউক্রেন পুনর্গঠনের জন্য কানাডার বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব নিতে চলেছেন।

সাবেক টরন্টো মেয়র জন টরির সাথে পুত্র টরি জুনিয়র

ফ্রিল্যান্ড ছিলেন ট্রুডো সরকারের সবচেয়ে প্রভাবশালী মন্ত্রীদের একজন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তিনি কানাডার মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন, আর অর্থমন্ত্রী ও উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মহামারী-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং বৈশ্বিক মঞ্চে কানাডার ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে মুখ্য ভূমিকা রাখেন। ইউক্রেন যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে কানাডার সক্রিয় অংশগ্রহণ কেবল মানবিক সহায়তার জন্যই নয়, বরং বৈশ্বিক নিরাপত্তা রাজনীতিতেও বড় ভূমিকা রাখবে। ফ্রিল্যান্ডের ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত হওয়ায় তার এই দায়িত্ব আরও প্রতীকী হয়ে উঠছে।

প্রশ্ন উঠছে, কেন হঠাৎ এত অভিজ্ঞ মন্ত্রীকে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি যেমন কার্নি সরকারের কৌশলগত পদক্ষেপ, তেমনি দলের ভেতরে নতুন নেতৃত্ব গড়ে তোলারও সুযোগ। ট্রুডো-যুগের মন্ত্রীদের ধীরে ধীরে কূটনৈতিক অঙ্গনে সরিয়ে দিয়ে কার্নি লিবারেল পার্টির মধ্যে প্রজন্মান্তর ঘটাতে চাইছেন। এতে তরুণ এমপি ও সম্ভাব্য নেতাদের সামনে পথ খুলে যাচ্ছে, যা আগামী নির্বাচনে নতুন উদ্দীপনা আনতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে জন টরি জুনিয়রের নাম উঠে আসা নতুন মাত্রা যোগ করছে। সাবেক টরন্টো মেয়র জন টরির ছেলে সম্প্রতি নিশ্চিত করেছেন যে তিনি ফেডারেল লিবারেল দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি টরন্টোর স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনের স্থানীয় কর্মীদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। এই আসনটি বর্তমানে বিল ব্লেয়ারের দখলে, যিনি কূটনৈতিক নিয়োগ পেলে পদত্যাগ করতে পারেন। তাই এমন পরিস্থিতিতে টরি জুনিয়রের আগ্রহকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট আসনের সামাজিক বাস্তবতাও এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। এটি বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক একটি এলাকা, যেখানে ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, ফিলিপিনো এবং চীনসহ নানা দেশ থেকে আগত অভিবাসীদের বসবাস রয়েছে।

২০২১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, এই আসনের প্রায় ৮ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন, যার মধ্যে ভারতীয় বাঙালিও অন্তর্ভুক্ত। যদিও এ হার মোট জনসংখ্যার তুলনায় ছোট, তবু এটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি এখানে উপেক্ষা করার মতো নয়।

স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকের বিশ্বাস, তাদের একজন প্রার্থী দাঁড়ালেই বিজয় নিশ্চিত হবে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ভিন্ন মত দেন। তাদের মতে, মূলধারার রাজনীতিতে সাফল্যের জন্য কেবল জাতিগত বা ভাষাগত পরিচয় যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন যোগ্যতা, দলীয় সমর্থন, দীর্ঘদিনের মাঠ পর্যায়ের কাজ এবং স্থানীয় ভোটারদের আস্থা। এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কোনো প্রার্থী সেই মাত্রার প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, এখন থেকেই যদি নতুন প্রজন্ম মাঠ পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করে, তাহলে খুব দূর ভবিষ্যতে নয়, স্কারবোরো সাউথওয়েস্ট থেকে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কোনো প্রার্থীর বিজয় বাস্তবে পরিণত হতে পারে। আর জাতীয় রাজনীতিতে যখন নতুন নেতৃত্ব খোঁজার প্রক্রিয়া চলছে, তখন অভিবাসী সম্প্রদায়গুলোর ভূমিকা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language