সম্পাদকের পাতা

ইউরোপের হৃদয়ে এক স্বপ্নিল নগরী জেনেভা

নজরুল মিন্টো

গতকাল (১৮ সেপ্টেম্বর) লন্ডন থেকে আমরা (আমি ও সিরাজুল মুনির) জেনেভায় অবতরণ করলাম। ইউরোপের মধ্যভাগে অবস্থিত সুইজারল্যান্ডের এক অনন্য নগরী জেনেভা। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং বিশ্বজনীন বৈশিষ্ট্যে খ্যাত এ শহর। আল্পস ও জুরা পর্বতমালার কোলে, বিশাল লেক জেনেভার তীরে গড়ে ওঠা এই শহর যেন প্রকৃতি ও আধুনিকতার এক সুষম সমন্বয়। বিমানবন্দরে আমাদের স্বাগত জানালেন অলিম্পিক শহর লুজান (Lausanne)-এর কমিউনিটি নেতা বেলায়েত উল্লাহ।

বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে যখন আমরা তার গাড়িতে উঠলাম, তখন জানালার বাইরের দৃশ্যপট চোখে পড়ল। চারপাশে শৃঙ্খলাবদ্ধ নগরীর ছাপ, দূরে পাহাড়ের আভাস, আর নীলাভ আকাশ যেন জেনেভার আগমনী বার্তা দিচ্ছিল। বেলায়েত উল্লাহর প্রাণবন্ত কথাবার্তায় ভ্রমণের ক্লান্তি যেন মিলিয়ে গেল। তিনি একদিকে আমাদের ভ্রমণ পরিকল্পনার খোঁজ নিচ্ছিলেন, অন্যদিকে নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি খুলে দিচ্ছিলেন।

প্রায় ঘন্টাখানেক হাইওয়ে ধরে চলার পর আমরা পৌঁছালাম বেলায়েত উল্লাহর লুজানের বাসভবনে। শহরের আবাসিক এলাকায় সযত্নে সাজানো বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই অনুভব করলাম আপ্যায়নের উষ্ণতা, আর আন্তরিক আতিথেয়তার পরিচ্ছন্ন সৌন্দর্য; সব মিলিয়ে প্রথম দিনেই আমাদের জেনেভা ভ্রমণ পেল এক আত্মীয়তাসূচক আবহ।

ভৌগোলিকভাবে জেনেভা শুধু সুইজারল্যান্ড নয়, বরং সমগ্র ইউরোপের যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম অক্ষের মিলনস্থলে থাকায় এটি ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন এবং কূটনীতির জন্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয় ও কার্যকরী। ফরাসি এখানে প্রধান ভাষা হলেও, ইংরেজি, জার্মান এবং আরও বহু ভাষার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।

জেনেভা বৈশ্বিক অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। জাতিসংঘ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের সদর দপ্তর এখানে অবস্থিত। প্রতিদিন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আগত কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক এবং গবেষকের আনাগোনায় এ শহরের জীবন ছন্দময় হয়ে ওঠে। শতবে জেনেভার অর্থনৈতিক সুনাম গড়ে উঠেছে মূলত দুটি খাতে। এক. সুইস ব্যাংকিং এবং দুই. ঘড়ি শিল্প।

সুইস ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরেই সারা বিশ্বের মানুষের কাছে নিরাপদ আর্থিক আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। জেনেভা সেই ব্যাংকিং ঐতিহ্যের অন্যতম কেন্দ্র। এখানে অবস্থিত বহু আন্তর্জাতিক ব্যাংক এবং প্রাইভেট ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের সর্বোচ্চ গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা প্রদান করে। ইতিহাসে দেখা যায়, ইউরোপের অস্থির রাজনৈতিক সময়ে ধনীরা, রাজপরিবারের সদস্যরা তাদের সম্পদ সুইস ব্যাংকে জমা রাখতেন। কারণ সুইস ব্যাংকিং আইনে গ্রাহকের পরিচয় ও লেনদেনের গোপনীয়তা কঠোরভাবে রক্ষা করা হয়। যদিও আধুনিক সময়ে আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতার দাবি মেনে কিছু পরিবর্তন এসেছে, তবুও সুইস ব্যাংক বিশ্বের ধনী ব্যক্তিদের ভরসার প্রতীক।

অন্যদিকে, ঘড়ি শিল্পে জেনেভা যেন এক অবিস্মরণীয় নাম। সুইস ঘড়ির গুণমান, নকশা ও কারিগরি দক্ষতা পৃথিবীব্যাপী সুপরিচিত। ১৬শ শতকে এখানে ঘড়ি শিল্পের বিকাশ শুরু হয়, আর ধীরে ধীরে জেনেভা হয়ে ওঠে ঘড়ি নির্মাণের রাজধানী।

এখানকার প্রতিটি ঘড়ি যেন নিখুঁত যন্ত্রশিল্প আর শিল্পকলার সমন্বয়। রোলেক্স, প্যাটেক ফিলিপ, ফ্রাঙ্ক মুলার—এসব নাম শুধু একটি ঘড়ি নয়, বরং ঐতিহ্য, মর্যাদা আর জীবনদর্শনের প্রতীক।

জেনেভার ঘড়ি শিল্প গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্যও বিখ্যাত। নকশার সূক্ষ্মতা, যান্ত্রিক দক্ষতা এবং টেকসই মান বজায় রাখার মাধ্যমে সুইস ঘড়ি শিল্প বিশ্ববাজারে আজও একক আধিপত্য ধরে রেখেছে। বছরে লাখ লাখ পর্যটক ঘড়ির দোকান, জাদুঘর এবং প্রদর্শনীতে ভিড় জমায়।

এই ব্যাংকিং ও ঘড়ি শিল্পের সাফল্য, সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংস্থার উপস্থিতি, জেনেভাকে বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল শহরে পরিণত করেছে। আবাসন, খাদ্য, পরিবহন কিংবা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার খরচ সবই গড়পড়তা সাধারণ ইউরোপীয় শহরের তুলনায় বহুগুণ বেশি।

সংস্কৃতি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে জেনেভা বহুমাত্রিক। শহরজুড়ে ছড়িয়ে আছে জাদুঘর, আর্ট গ্যালারি, থিয়েটার এবং সঙ্গীত উৎসব। জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে। ফলে শিক্ষার্থীদের বহুসাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে জেনেভা পেয়েছে এক বিশ্বজনীন শিক্ষার আবহ।

অভিবাসীদের জন্য জেনেভা এক উন্মুক্ত শহর। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মানুষ এখানে বসবাস করছে, কাজ করছে এবং নিজেদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখছে। ফলে জেনেভা এক বহুজাতিক, বহুসাংস্কৃতিক মিলনস্থল হয়ে উঠেছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকে শহরটি উন্নত ও সুসংগঠিত। বিমানবন্দর, রেলপথ, হাইওয়ে এবং লেক-ভিত্তিক নৌপরিবহন শহরটিকে ইউরোপের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নগরীর সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। শহরের ভেতরে ট্রাম, বাস ও সাইকেল চলাচলের সুবিধা জেনেভাকে একদিকে করেছে পরিবেশবান্ধব, অন্যদিকে আধুনিক নগরীর আদর্শ রূপে উপস্থাপন করেছে।

সব মিলিয়ে জেনেভা আজ শুধু সুইজারল্যান্ড নয়, সমগ্র ইউরোপের জন্য এক কৌশলগত নগরী—যেখানে বৈশ্বিক রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়েও শহরটি তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অটুট রেখেছে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language