
টরন্টোর গ্রীষ্ম এক আশ্চর্য সময়—যেন প্রকৃতির ক্যানভাসে আঁকা একটি জীবন্ত চিত্রপট। বসন্তের আবছা রঙ ছাপিয়ে যখন গ্রীষ্ম তার পূর্ণ বিকাশে আসে, তখন আকাশ হয়ে ওঠে ঘন নীল, গাছের পাতা ঝিকমিক করে সূর্যরশ্মিতে, আর জনপদ জেগে ওঠে এক স্বপ্নালু উচ্ছ্বাসে। শহরের প্রতিটি প্রান্ত যেন বলে ওঠে—“এইতো সময়, জীবনকে নতুন করে ছুঁয়ে দেখার!”
টরন্টোর গ্রীষ্মকাল যেন শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এক উন্মুক্ত উৎসব। দিনের শুরুটাই যেন এক আলোকময় ঘটনার মতো—সকাল সাতটা বাজতেই টরন্টো ট্রানজিট কমিশনের বাস, ট্রাম আর সাবওয়ে যেন এক বিশাল সুরের বন্যায় ভেসে চলে। অফিসগামী মানুষদের মুখে থাকে দ্রুততার ছন্দ।
ভোরে সাবওয়ে এবং বাসগুলোতে দাঁড়াবার জায়গা থাকে না। মানুষ ছুটছে, গাড়ি ছুটছে, দোকানপাট খোলার ব্যস্ততা-সব মিলিয়ে এক ছন্দময় ব্যস্ততা। এ ছোটাছুটি দেখার মতো। কর্মজীবী মানুষের সঠিক সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত হওয়ার ব্যস্ততা এ দেশের মানুষের সময়ানুবর্তিতার একটি প্রমাণ। জেনে রাখা ভালো- টরন্টোতে গ্রীষ্মকালে প্রতিদিন গড়ে ২০ লক্ষ যাত্রী TTC ব্যবহার করে, যা কানাডার অন্য যে কোনও শহরের তুলনায় সর্বাধিক।

টরন্টোর গ্রীষ্ম শুধুই এক ঋতু নয়, এটি এক আবেগ, এক উচ্ছ্বাস, এক ভালো লাগার অনুভূতি। এটি নতুন উদ্যমে জীবনকে উপভোগ করার সময়। কানাডার মানুষ এই সময়টিকে পুরোপুরি উপভোগ করে, তাদের জীবনযাত্রা যেন গতি পায়, প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
সামারে টরন্টোর ফুটপাতে ফেরিওয়ালাদের দোকানগুলো চমৎকার। সকাল থেকেই শহরের ফুটপাতে বসে যায় তারা। অনেক ভালো ভালো জিনিস এদের কাছে পাওয়া যায়। দামে যেমন সস্তা, তেমনি আছে বৈচিত্র্যের সমাহার। ঘড়ি, কলম, টি-শার্ট, নানা ধরনের চেইন, কানের দুল, স্যান্ডেল, মোজা, টাই-অনেক কিছু। এখানে দর কষাকষি করে জিনিস কিনতে হয়। বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে টরন্টোতে প্রতি বছর প্রায় ১৫০০ স্ট্রিট ভেন্ডর লাইসেন্স ইস্যু করা হয়; আর এই সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে।
সামারের আরেকটি চমৎকার দিক হলো স্ট্রিট পারফর্মারদের বিচিত্র সব পরিবেশনা। ইয়াং-ডান্ডাস স্কয়ার কিংবা সাবওয়ে স্টেশনের সামনে, গিটার হাতে গান গেয়ে চলে শিল্পীরা। কেউ কেউ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বা ম্যাজিক দেখিয়ে পথচারীদের মুগ্ধ করে। আর কৃতজ্ঞতা স্বরূপ যদি কেউ কিছু অর্থ দেয়, তবে তাদের মুখের উজ্জ্বল হাসি যেন পুরো শহরকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়।

বিকেলে ডানডাস-ইয়াং চৌরাস্তার মোড়ে, ঠিক ইটন সেন্টারের সামনে বসে চিত্রকরদের মেলা।চিত্রশিল্পীরা তাদের তুলির জাদুতে এঁকে ফেলেন মুহূর্তকে চিরন্তন করে রাখার প্রতিশ্রুতি। প্রোফাইল স্কেচ, কার্টুন পোর্ট্রেট, বা আধুনিক বিমূর্ত চিত্র। কোনটা চান? আপনি ইচ্ছে করলে মাত্র ১০-২০ ডলারের বিনিময়ে আপনার প্রোফাইল আঁকিয়ে নিতে পারেন।
গ্রীষ্মের সন্ধ্যা যেন আরও বেশি বর্ণিল। দিনের আলো যখন ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসে, পশ্চিম আকাশে সূর্য তখন লাল-কমলা-সোনালি রঙ মেখে এক অপূর্ব বিদায়বেলার দৃশ্য রচনা করে। সেই মুহূর্তে লেক অন্টারিওর ধারে বসে থাকা মানুষদের চোখে ফুটে ওঠে বিস্ময় ও প্রশান্তির ছায়া। ঠান্ডা বাতাসের মৃদু পরশে যেন দিনের ক্লান্তি মুছে যায়, আর অন্তরে জমে থাকা বেদনাগুলো উড়ে যায় জলের ঢেউয়ের সাথে।
কেউ হাতে হাত রেখে কাঠের ডেকে হেঁটে চলে, কেউ বা একা বসে থাকে গিটার কোলে নিয়ে, আঙুলের স্পর্শে টেনে আনে নিঃসঙ্গ সুর। শিশুরা ছুটে বেড়ায় ঘাসে, দূরে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণী কানে হেডফোন লাগিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে; আর সূর্যরশ্মির প্রতিফলন লেকের জলে গড়ে তোলে এক অদ্ভুত মোহময় পরাবাস্তবতা। আকাশের রঙ বদলে যাওয়ার সেই নিস্তব্ধ রূপান্তর যেন কিছু সময়ের জন্য সবাইকে থামিয়ে দেয়—মানুষ, পাখি, বাতাস, কোলাহল—সব যেন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, শুধুই দেখার জন্য, শুধুই অনুভবের জন্য।
কিন্তু সূর্য ডুবে গেলেও টরন্টোর গ্রীষ্ম যেন কখনো ঘুমোয় না। বরং সন্ধ্যার পর শহর পায় এক নতুন মাত্রা। আলো আর সুরের এক অব্যক্ত ভাষায় শহর যেন উৎসবের ভেতর প্রবেশ করে। শহরের বিভিন্ন চত্বরে, পার্কে কিংবা ট্রাফিক মোড়ের খোলা মঞ্চে শুরু হয় ছোট ছোট কনসার্ট। তরুণ-তরুণীরা নিয়ে আসে তাদের যন্ত্র, কণ্ঠ আর স্বপ্ন।

এ শহরের গ্রীষ্ম শুধু রৌদ্র নয়, সে এক সুরের নদী। মেট্রো স্টেশনের পাশে, স্ট্রিটলাইটের নিচে বা লাইব্রেরির সামনের উন্মুক্ত চত্বরে যে সংগীত ছড়িয়ে পড়ে—তা হয়তো কোনো অচেনা শিল্পীর হাত ধরে একদিন গড়বে বিশ্বমঞ্চের ইতিহাস। আর যারা শুনছে? তারা হয়তো অফিস শেষে ফিরছে ক্লান্ত হয়ে, কিংবা শুধু একটু ভালো লাগার খোঁজে নেমেছে রাস্তায়—কিন্তু তারা সবাই কিছু সময়ের জন্য স্থির হয়ে যায়, শুনতে থাকে মন উজাড় করে।
এই সন্ধ্যা তাই শুধু রঙিন নয়—এটি এক অনুভব, এক নিরব অভিসার, যেখানে শহর, সঙ্গীত ও মানবিকতা একসূত্রে বাঁধা পড়ে যায়।
সামারে টরন্টোর নিয়মিত স্কুলগুলো বন্ধ। তবে বেশ ক’টি সামার স্কুল চালু থাকে। স্থানসংকুলানের কারণে অনেক ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি হতে পারে না। স্কুল বন্ধ থাকায় অনেক অভিভাবক ঘরে বাংলা বা আরবি শেখানোর জন্য বিশেষ শিক্ষক রাখেন। এর ফলে শুধু ভাষাই নয়, শিশুদের মধ্যে সাংস্কৃতিক শিকড়গুলোও দৃঢ় হয়। শহরের মসজিদগুলোতেও বিশেষ ক্লাসের আয়োজন থাকে, যেগুলোতে শিশুদের ইসলামিক নীতিমালা ও জীবনদর্শন শেখানো হয়।
সামার ট্রিপের জন্য অনেকেই কানাডার বিখ্যাত পর্যটনস্থানে বেড়াতে যান। নায়াগ্রা ফলস, মনট্রিয়ল, অটোয়া কিংবা ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার পাহাড়ি অঞ্চল-সবই ভ্রমণপিপাসুদের জন্য আদর্শ গন্তব্য। যারা দূরে যেতে চান না, তারা শহরের মধ্যেই বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান যেমন সিএন টাওয়ার, রিপলির অ্যাকোয়ারিয়াম, আইল্যান্ডস বা ওয়ান্ডারল্যান্ড ঘুরে আসতে পারেন।
দূর-দূরান্তে যারা যেতে চান তাদের আগে থেকে প্রোগ্রাম তৈরি করতে হয়। টিকিট আগে না করে থাকলে চড়া দামে কিনতে হতে পারে। আর মনট্রিয়ল, অটোয়া, যারা যেতে চান কিংবা টরন্টোতে কেউ আসতে চাইলে একটি ভালো সুযোগ আছে। অর্থাৎ শহর তিনটিতে বেশ কিছু প্রাইভেট রাইডিং সার্ভিস রয়েছে যারা অত্যন্ত কম ভাড়ায় প্যাসেঞ্জার আনা-নেওয়া করে থাকে। বর্তমানে “Rideshare Canada,” “Poparide,” বা “VIA Rail” এর মতো প্ল্যাটফর্মে আগে থেকে বুকিং করে টরন্টো-মনট্রিয়ল-অটোয়া ভ্রমণ করা যায় অল্প খরচে।
আনন্দের শহর টরন্টো। সামারে কানাডার বাংলাদেশ কমিউনিটির কর্মতৎপরতা বেড়ে যায়। চারিদিকে অনুষ্ঠান আর অনুষ্ঠান। উইকএন্ডগুলোতে থাকে তুঘলকি ব্যাপার-স্যাপার। বাঙালিদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল আকারের স্ট্রিট ফেস্টিভ্যাল; আয়োজন করা হয় বড় বড় মেলা। এসব আয়োজনে অংশগ্রহণ করেন সংগীত জগতের বড় বড় তারকারা। এছাড়া পুরো সামার জুড়ে থাকে বিভিন্ন সংগঠন আয়োজিত পিকনিক। প্রতিটি আয়োজনই আনন্দদায়ক, মনোমুগ্ধকর।
টরন্টোর গ্রীষ্ম শুধুই এক ঋতু নয়, এটি এক আবেগ, এক উচ্ছ্বাস, এক ভালো লাগার অনুভূতি। এটি নতুন উদ্যমে জীবনকে উপভোগ করার সময়। কানাডার মানুষ এই সময়টিকে পুরোপুরি উপভোগ করে, তাদের জীবনযাত্রা যেন গতি পায়, প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।









