
পৃথিবীর বিস্তৃত প্রান্তরে আমরা কেউ লম্বা, কেউ খাটো। আকাশের দিকে তাকিয়ে কেউ স্বপ্ন দেখে, আবার কেউ আকাশ ছুঁয়ে দেয় বাস্তবেই। লম্বা হওয়াটা অনেকের কাছে সৌভাগ্যের, আবার কারো জন্য তা নিছকই অসুবিধার কারণ। এমনই গল্প টরন্টোর এক তরুণী জেরি রোজের, যিনি মাত্র ১২ বছর বয়সেই পৌঁছে গিয়েছিলেন ৬ ফুট ১ ইঞ্চি উচ্চতায়।
তার জীবনের শুরুটা ছিল বেশ অসুবিধাজনক। দোকানে নিজের জন্য মানানসই পোশাক খুঁজে পাওয়া ছিল বিরাট এক যুদ্ধের মতো। পথ চলতে গেলে মানুষের বিস্মিত চোখগুলো তার দিকে তাকিয়ে থাকতো। দু-দরজার গাড়িতে উঠতে গেলে মাথা ঠুকে যাওয়ার আশঙ্কায় সবসময়ই থাকতে হতো সতর্ক। সিনেমা হলে বা মঞ্চে সামনে বসলে পেছনের মানুষজন বিরক্ত হতেন। সাধারণ বিছানাগুলোতে পা ঝুলে থাকত, স্কুলের ক্লাসরুমের ডেস্কটাও যেন তার সঙ্গে এক ধরনের শত্রুতা করতো!
কিন্তু লম্বা হওয়ার যে শুধু অসুবিধাই নয়, বরং আনন্দ ও গৌরবের ব্যাপার হতে পারে, তা উপলব্ধি করলো জেরি রোজ। তিনি একদিন যোগ দিলেন টরন্টোর ‘টল ক্লাব’-এ। সেখানে প্রথম দিনেই তিনি আবেগে আপ্লুত হয়ে বলেছিলেন, ‘এখানে এসে আমি অত্যন্ত খুশি! এত লম্বা মানুষদের মাঝে মনে হচ্ছে আমিই সবচেয়ে ছোট!’
‘টল ক্লাব’ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা লম্বা মানুষদের একটি বিশেষ ক্লাব। এর শুরুটা হয়েছিল ১৯৩৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায়। বর্তমানে, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় লম্বা মানুষের জন্য প্রায় ৫০টি ক্লাব সক্রিয় রয়েছে। ইউরোপে এই সংখ্যা প্রায় ৪৫টি। এই ক্লাবগুলোর সদস্যপদের জন্য সাধারণত উচ্চতার নির্দিষ্ট মানদন্ড রয়েছে। উত্তর আমেরিকায়, নারীদের জন্য ন্যূনতম উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি এবং পুরুষদের জন্য ৬ ফুট ২ ইঞ্চি প্রয়োজন। টরন্টোর ক্লাবটিতে বর্তমানে একশোরও বেশি সদস্য রয়েছে, যাদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা সদস্যটির উচ্চতা ৬ ফুট ৮ ইঞ্চি।
ক্লাবের প্রতি মাসে আয়োজন করা হয় বিভিন্ন ধরনের মনোরঞ্জনের অনুষ্ঠান- নাচ, গান, খেলাধুলাসহ থাকে অসংখ্য আনন্দ-আয়োজন। কিন্তু শুধু বিনোদনেই সীমাবদ্ধ নেই ক্লাবের কার্যক্রম। সমাজের অসুবিধাগ্রস্ত মানুষদের সাহায্যের জন্য নিয়মিতভাবে অর্থ সংগ্রহ করা হয়। হাসপাতালগুলোতে লম্বা মানুষদের জন্য আলাদা বিছানা কেনার ব্যবস্থাও করে তারা।
জেরি রোজের জন্য টল ক্লাব হয়ে ওঠে স্বপ্ন পূরণের জায়গা। ইতিমধ্যে তিনি ‘মিস টল টরন্টো’ হিসেবে সম্মানিত হয়েছেন। তার বয়ফ্রেন্ডও লম্বা-৬ ফুট ৩ ইঞ্চি। এই যুবক ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাস করেন।
জেরি রোজ এখন তার উচ্চতা নিয়ে গর্বিত। নিজের উচ্চতা সম্পর্কে তিনি হাসিমুখে বলেন, ‘একসময় লম্বা হওয়াটা আমার জন্য বিড়ম্বনা ছিল। এখন সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব।’
আরও কিছু তথ্য:
১৯৩৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায়, যখন প্রথম লম্বা মানুষের ক্লাব গঠিত হয় এরপর থেকে সংগঠনটি উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপসহ বিভিন্ন স্থানে সম্প্রসারিত হয়ে টল ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল গঠন করে। Tall Clubs International, সংক্ষেপে TCI হলো লম্বা ব্যক্তিদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংগঠন, যা তাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং দাতব্য কার্যক্রমের মাধ্যমে সংযুক্ত করে। এই সংগঠনটি লম্বা ব্যক্তিদের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টি, শিক্ষাবৃত্তি প্রদান, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখার লক্ষ্যে কাজ করে।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা পুরুষ ও নারী হলেন সুলতান কোসেন। তিনি তুরস্কের বাসিন্দা তার উচ্চতা ৮ ফুট ২.৮ ইঞ্চি (২৫১ সেন্টিমিটার)। সুলতান কোসেন এতটাই লম্বা যে তিনি লাফ না দিয়েও বাস্কেটবল রিং স্পর্শ করতে পারেন। বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা জীবিত নারী হলেন তুরস্কের রুমেইসা গেলগি। তার উচ্চতা ৭ ফুট ০.৭ ইঞ্চি (২১৫ সেন্টিমিটার)।
এর আগে, চীনের ইয়াও ডিফেন ৭ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতা নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা নারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে, তিনি ২০১২ সালে মৃত্যুবরণ করেন। পরে, ব্রাজিলের মারিয়া ফেলিসিয়ানা ডস সান্তোস, যার উচ্চতা ছিল ৭ ফুট ৩.৮ ইঞ্চি, তিনি এই শিরোপা ধারণ করেন। মারিয়া ২০২৪ সালের এপ্রিলে মৃত্যুবরণ করেন।
লম্বা ব্যক্তিরা প্রায়শই দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন, বিশেষ করে ভ্রমণের ক্ষেত্রে। বিমান বা ট্রেনে যাতায়াতের সময় তাদের জন্য আসন ও স্থান সংকুলান একটি সাধারণ সমস্যা। অনেক সময় তাদের অতিরিক্ত জায়গার জন্য অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। তবে, অনেক বিমান সংস্থা এবং পরিবহন প্রতিষ্ঠান লম্বা যাত্রীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে।
মজার একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য হলো, মহাশূন্যে গেলে মানুষ কিছুটা লম্বা হয়। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অভাবে মেরুদন্ডের উপর কোনো চাপ না থাকায় মেরুদন্ডের দৈর্ঘ্য কিছুটা বৃদ্ধি পায়। ফলে একজন মহাকাশচারী মহাশূন্যে অবস্থানকালে প্রায় ২ ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারেন।









