
বার্মিংহামের আকাশটা ধূসর, মাঝে মাঝে সোনালি আলো এসে মাটির রং পাল্টে দেয়। পাতাঝরার দিনে রাস্তাঘাটে লাল-হলুদের মিছিল, আর বসন্তে বৃষ্টি যেন কেবল ফুল গজানোর ইশারা। এই শহরের বুক চিরে চলে গেছে শতশত রাস্তা-কিছুটা নতুন জীবন খোঁজার পথে, কিছুটা পুরোনো জীবন ভুলে থাকার আশায়।
অ্যালাম রক, স্মল হিথ, অ্যাস্টন-এই এলাকাগুলো যেন এক একটি ক্ষুদ্র বাংলাদেশ। বার্মিংহামে বাংলাদেশি অভিবাসীরা প্রথম পা রাখেন ১৯৬০-এর দশকে।
এই শহরেরই এক কোণে, পেলহ্যাম রোডের একটি বাড়িতে একদিন নিঃশব্দে নিভে গেল এক জীবন-নাম ছিল তার লিলিমা আক্তার মুন্নী। তার গল্প আজও বার্মিংহামের বাতাসে ভাসে, এক দীর্ঘশ্বাস হয়ে।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মেয়ে লিলিমা। শান্ত স্বভাব, বড় চোখ, স্বপ্ন দেখার অভ্যেস ছিল তার। পরিবারের অনেক আশা ছিল, বিদেশে বিয়ে হচ্ছে-ছেলেটি ইংল্যান্ডে থাকে, ভবিষ্যৎ নিরাপদ হবে।
সিলেটের জকিগঞ্জের ছেলে মোহাম্মদ লিয়াকত আলী, ১৯৯৮ সাল থেকে বার্মিংহামে বসবাস করছে। সে অটোমোবাইল কারখানায় কাজ করে। ২০০৪ সালে পারিবারিক পছন্দে বিয়ে অনুষ্ঠিত হলো। বিয়ের পরের বছরই লিলিমা চলে আসে বার্মিংহামে-নতুন ঘর, নতুন জীবন।
কিন্তু নতুনত্ব শুধু শহরের ছিল, জীবনের নয়। লিয়াকতের চোখে ছিল স্ত্রীর সম্পত্তি। বাংলাদেশে স্ত্রীর পরিবারের একটি জমির প্রতি তার লালসা হয়ে যায়। শ্বাশুড়ি সেই জমি মেয়ের জামাইয়ের নামে লিখে দিতে অস্বীকৃতি জানাতেই শুরু হলো দাম্পত্যের ভেতরে বিষ ঢালা। প্রথমে হালকা চিৎকার, পরে ধমক, তারপর লাথি-ঘুষি। লিলিমা বুঝতে পারেনি, নতুন দেশে তার ভবিষ্যৎ কেবলই কাঁটা দিয়ে বিছানো।
২০০৮ সালে প্রথম পুলিশ আসে। এক রাতে প্রতিবেশীরা ফোন করেছিল-চিৎকার শুনেছে। পুলিশ এসে দেখে, লিলিমার গাল ফোলা, চোখ লাল। লিয়াকতকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। কিন্তু সে যে আগুন, একটুখানি পানিতে নিভে যায় না।
এ দম্পতির দুটি সন্তান-তানিয়া আর সুমাইয়া। বড়টির বয়স তখন ৮, ছোটটির ৫। তাদের চোখে মা ছিলেন পৃথিবীর আশ্রয়, আর বাবা এক অভ্যস্ত ভয়।
২০১৩ সালের ১৩ জুন, স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল। দুই বোন দাঁড়িয়ে ছিল স্কুল গেটের পাশে-মা আসবে, হাত ধরে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু মা এলো না। সময় গড়িয়ে সন্ধ্যা, তারপর রাত। পরিবারের এক আত্মীয় ফোন করলেন পুলিশে।

১৪ জুন ভোরবেলা, পুলিশ এল সেই ভাড়া করা বাড়িতে। দরজা বন্ধ, বাতি জ্বলছে না, চারপাশ নিস্তব্ধ। দরজা ভেঙে ঢুকে সিঁড়ির নিচে, এক কোণে পড়ে থাকতে দেখা গেল লিলিমার শরীর। গলায় দাগ-বদ্ধ ও অস্থির হাতের ছাপ। ময়নাতদন্ত বলল, সে অনেকক্ষণ ধরে শ্বাসরোধের শিকার হয়েছে।
আর লিয়াকত? সে বাইরে ঘুরছিল। অভিনয় করছিল, ‘লিলিমা কোথায়? স্কুল থেকে বাচ্চাদের নেয়নি কেন?’ সে জানতো, অভিনয়ই এখন তার বাঁচার একমাত্র চেষ্টা।
বিচার শুরু হলো বার্মিংহাম ক্রাউন কোর্টে। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি রবার্ট প্রাইস জানালেন, এটি একটি ‘ঠান্ডা মাথায় করা হত্যাকান্ড’। কোর্ট শুনলো, লিয়াকত বলেছিল, ‘জমির দলিল আমার নামে না করলে আমি ওকে মেরে ফেলব।’ এবং সে ঠিকই মেরে ফেলেছে।
বিচারক প্যাট্রিক থমাস রায় দিলেন-জীবনভর কারাদন্ড। কমপক্ষে ১৫ বছর থাকতে হবে শিকলপরা বন্দিত্বে।
বার্মিংহামের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে এলো গভীর শোক। সেই সন্ধ্যায় মসজিদের ইমাম বললেন, ‘লিলিমা আমাদের সমাজের এক প্রতীক। আমরা কতটুকু নিরাপদ করেছি আমাদের নারীদের জন্য? বিদেশে এসেও যদি তারা গৃহে অনিরাপদ থাকে, তাহলে আমাদের সভ্যতা কোথায়?’
এক প্রতিবেশী, যিনি প্রায়ই লিলিমার সঙ্গে বাজার করতেন, বললেন, ‘মেয়েটা খুব চুপচাপ ছিল। কখনো কারও বদনাম করত না। নিজের কষ্ট নিজের ভেতর রাখত।’
এক আত্মীয় বলেন, ‘আমরা তো ভেবেছিলাম সে ভালো আছে। কে জানতো, এতটা অসহায় হয়ে গিয়েছিল!’
তাদের ছোট মেয়ে সুমাইয়া আজও রাতে ঘুমাতে পারে না। সে বলে, ‘আমার মা কই?’ বড় মেয়ে তানিয়া এখন ১৩, কিন্তু সে কোনো কথা বলে না-চুপ করে তাকিয়ে থাকে জানালার বাইরে।
মুক্তাগাছায় লিলিমার মা আজও সেই জমির পাশে হাঁটেন, যেটির জন্য তার মেয়েকে দিতে হয়েছে জীবন। জমির মাপ বদলায়, দলিল বদলায়, কিন্তু বুকের শূন্যতা থেকে যায় স্থায়ী।









