
ঢাকা, ১৩ নভেম্বর- রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষিকা নাজমুন নাহার (৪৭)। মোহাম্মদপুর ডাকঘর থেকে ২০১৮ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি পারিবারিক সঞ্চয়পত্র কিনেছিলেন তিনি, তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সেটি ভেঙে ফেলেছেন। কারণ করোনা মহামারির জেরে আয় কমে যাওয়া।
নাজমুন নাহার জানান, করোনার কারণে স্কুল বন্ধ থাকায় তাঁর বেতন অনেকটাই বন্ধ। কাজ হারিয়েছেন কম্পানিতে চাকরি করা তাঁর স্বামীও। এই অবস্থায় দুই সন্তানসহ তাঁদের চার সদস্যের পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। কোনো উপায় না পেয়ে শেষ অবলম্বনটুকু ভেঙে ফেলেছেন তিনি।
নাজমুন নাহারের মতো অনেকেই এখন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সঞ্চয় ভাঙতে বাধ্য হচ্ছেন।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের প্রশাসন ও জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক রাজিয়া বেগম জানান, চলতি বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। তবে এ সময়ে ভাঙা হয়েছে ১৬ হাজার ২৮৩ কোটি ২২ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। অর্থাৎ সঞ্চয়ের বিপরীতে প্রায় ৬০ শতাংশ ভাঙা হয়েছে। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই ছয় হাজার ১৮০ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র ভাঙা হয়েছে বলে জানান তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কয়েকটি ব্যাংক ও পোস্ট অফিসে বেশ কয়েকজন সঞ্চয়কারীর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তাঁরা জানান, করোনার কারণে তাঁদের অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন, কারো কারো আয় কমে গেছে। সে কারণে বাধ্য হয়ে সঞ্চয়ে হাত দিচ্ছেন তাঁরা।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, করোনার কারণে এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে, যা দেশের শ্রমশক্তির ২০ শতাংশ।
একটি বেসরকারি কম্পানিতে চাকরি করতেন মনসুর আহমেদ। করোনা পরিস্থিতিতে তিনি চাকরি হারিয়েছেন। দুই বছর আগে কেনা পারিবারিক সঞ্চয়পত্র থেকে টাকা তুলে নিতে এসেছিলেন তিনি মোহাম্মদপুর ডাকঘরে। বললেন, করোনার সময় তাঁকে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া হয়। হাতে টাকা নেই। তাই খাওয়া-বাড়িভাড়ার জন্য টাকা দরকার। এ জন্য তিনি সঞ্চয়পত্র থেকে ১০ লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন।
ডাকঘরের পাশাপাশি সোনালী ব্যাংকেও সঞ্চয়পত্র ভাঙছেন অনেক গ্রাহক। মোহাম্মদপুর টাউনহল শাখার সোনালী ব্যাংকের সঞ্চয়পত্র বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, করোনার পর থেকে সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলার আনুপাতিক হার তুলনামূলকভাবে বেশি। সপ্তাহে যদি দু-তিনজন সঞ্চয়পত্র কিনতে আসেন, তাহলে ভেঙে ফেলার জন্য আসেন সাত থেকে ১০ জন।
মোহাম্মদপুরের কলেজ গেটের সোনালী ব্যাংকের সঞ্চয়পত্র বিভাগের প্রিন্সিপাল অফিসার মাহবুবা আক্তার জানান, গ্রাহকরা সপ্তাহে দু-একটি করে সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলছেন নির্ধারিত সময়ের আগেই। অক্টোবর মাসেই কমপক্ষে ৩০ জন সঞ্চয়পত্র ভেঙেছেন, যার বেশির ভাগই পারিবারিক সঞ্চয়পত্র ছিল বলে জানান তিনি।
মোহাম্মদপুরের ডাকঘর সঞ্চয়পত্রসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অনেক মানুষ সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলছে। সঞ্চয়পত্রের অপারেটর ম্যানেজার শাহজাহান হোসেন বলেন, গত এপ্রিল মাস থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ২৫-৩০ জন সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলছেন। গত ছয় মাসে কমপক্ষে পাঁচ হাজার মানুষ নির্ধারিত সময়ের আগে সঞ্চয়পত্র থেকে টাকা তুলে নিয়েছে বলে জানান তিনি।
সঞ্চয় ভেঙে ফেলার কারণে জানতে চাইলে সরকারি অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহিদ মালেক জানান, তিনি ও তাঁর স্ত্রী ভাড়া বাসায় থাকেন। প্রতিনিয়ত সব জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। সঞ্চয়পত্র থেকে প্রতি মাসের মুনাফা দিয়ে সব খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই সঞ্চয়পত্র ভেঙে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।
কয়েক বছর ধরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়ছিল। তবে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে বেশ কিছু শর্ত ও বাধ্যবাধকতা আরোপ করে সরকার। এতে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে কিছুটা ভাটা পড়ে। করোনা পরিস্থিতিতে তার আরো অবনতি হয়েছে।
সূত্র: কালের কন্ঠ
আর/০৮:১৪/১৩ নভেম্বর









