এক দশকে পাকিস্তানের বৈদেশিক ঋণ প্রায় দ্বিগুণ, ছাড়িয়েছে ১৩৫ বিলিয়ন ডলার

ইসলামাবাদ,০৬ নভেম্বর-বিশ্বব্যাংকের ‘আন্তর্জাতিক ঋণ রিপোর্ট ২০২৬’-এর হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এক দশকে পাকিস্তানের মোট বৈদেশিক ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০১৫ সালে দেশটির মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল ৬৮ দশমিক ৬৭৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩৫ দশমিক ১০৭ বিলিয়ন ডলারে।
এই মোট বৈদেশিক ঋণের মধ্যে সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ রয়েছে ১০৭ দশমিক ০৭৬ বিলিয়ন ডলার। বেসরকারি গ্যারান্টিহীন ঋণের পরিমাণ ১৭ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ ১০ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের উৎস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে বহুপাক্ষিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে। এ খাতে পাকিস্তানের ঋণের পরিমাণ ৫৬ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার। দ্বিপাক্ষিক ঋণদাতাদের কাছে দেশটির ঋণ ৪২ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার এবং বেসরকারি ঋণদাতাদের কাছে ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। একক দেশ হিসেবে চীন এখনো পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় ঋণদাতা। দেশটির কাছে পাকিস্তানের বকেয়া ঋণের পরিমাণ ২২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। একক ঋণদাতাদের তালিকায় চীনের পরেই রয়েছে বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এই দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে পাকিস্তানের ঋণ যথাক্রমে ১৯ দশমিক ২ বিলিয়ন ও ১৬ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেদনে ঋণের শর্ত সম্পর্কেও তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সরকারি ঋণদাতাদের দেওয়া ঋণের গড় মেয়াদ ১৬ বছর। এর মধ্যে চার বছর গ্রেস পিরিয়ড বা ঋণ পরিশোধে ছাড়ের সময় রয়েছে। এসব ঋণের গড় সুদের হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ঋণের গড় সুদের হার ৮ দশমিক ৬ শতাংশ। এসব ঋণ পরিশোধের গড় মেয়াদ মাত্র তিন বছর এবং গ্রেস পিরিয়ড ছিল এক বছর।
মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান নিয়ে গঠিত মেনাপ অঞ্চলে গত বছর ঋণ পরিশোধ ও সুদের অনুপাতের ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে মোট জাতীয় আয়ের তুলনায় বৈদেশিক ঋণের অনুপাতের দিক থেকে পরিস্থিতির বড় অবনতি হয়েছে। ২০২৫ সালে এই অঞ্চলের ঋণ ও জিএনআই অনুপাত ২৬ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৯ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের অন্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় এক বছরে ঋণের অনুপাত বৃদ্ধির এই হার সবচেয়ে বেশি।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা হিসেবে ২০২৫ সালে পাকিস্তানের কাছে থাকা ২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধের সময় বাড়িয়ে দিয়েছে চীন। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যতের বড় ধরনের ধাক্কা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের বর্ধিত তহবিল সুবিধা এবং স্থিতিস্থাপকতা ও টেকসই কাঠামোর আওতায় নতুন করে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ছাড় করেছে।
বিশ্বের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মোট বৈদেশিক ঋণ ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি নতুন রেকর্ড। গত চার বছরের মধ্যে এটাই বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধির সবচেয়ে দ্রুত গতি। বন্ড ইস্যুর কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক হওয়া, মার্কিন ডলারের দরপতন এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের ঋণ দেওয়ার আগ্রহ ফিরে আসার কারণে এই বৃদ্ধি হয়েছে। বিশ্বজুড়ে মূলধন বাজার আবার উন্মুক্ত হলেও বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলোকে এই সুযোগ নিতে হয়েছে অনেক বেশি খরচে ও উচ্চ সুদে।
ঋণ বৃদ্ধির পেছনে মার্কিন ডলারের বড় ধরনের দরপতনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ২০২৫ সালে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর সরকারি ও সরকারি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ যে পরিমাণ বেড়েছে, তার ২৮ দশমিক ২ শতাংশই এসেছে ডলারের মান কমে যাওয়ার কারণে মুদ্রার মূল্যায়নজনিত পরিবর্তন থেকে। এর ফলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেওয়া অনেক বড় গ্রহীতা দেশ ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ঋণের মূল টাকা পরিশোধ করার পরও ডলারের মান পরিবর্তনের প্রভাবে বছর শেষে তাদের হিসাবের খাতায় মোট ঋণের পরিমাণ কমাতে পারেনি। বরং তা বেড়ে গেছে।
২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ দেওয়ার কার্যক্রমও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি ঋণের পরিমাণ ৫ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালে এই বৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ০ দশমিক ৬ শতাংশ। বন্ডহোল্ডারদের পাওনা ৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক ও অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাওনা ৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর ফলে বেসরকারি ঋণের এই বৃদ্ধি হয়েছে।
এস এম/ ০৬ নভেম্বর ২০২৬







