চলতি অর্থবছরে টিসিবির ভর্তুকি ৫০০-৬০০ কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য

ঢাকা,০২ নভেম্বর-ব্যাংকঋণের সুদ ও পরিচালন ব্যয় কমানো এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আয় বাড়িয়ে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)।
একই সঙ্গে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার পরিকল্পনা করেছে সংস্থাটি। তবে বর্তমানে ভর্তুকির আওতায় থাকা পণ্যগুলোর দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই।
টিসিবির চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ ফয়সল আজাদ বলেন, সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে সংস্থাটিকে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে পণ্য কেনার খরচ, ব্যাংকঋণের সুদ ও পরিচালন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ফয়সল আজাদ বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে আমরা ভর্তুকির ব্যয় ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য নিয়েছি। তবে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়লে সংস্থার মোট ভর্তুকির প্রয়োজনও বাড়তে পারে।’
২০২৫-২৬ অর্থবছরে টিসিবির ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৫১৪ কোটি ২২ লাখ টাকা। এ খাতে বাজেটে বরাদ্দ ছিল প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। পণ্য কেনা ও বিক্রির দামের পার্থক্য এবং ব্যাংকঋণের সুদ—এই দুটি খাতেই ভর্তুকির বড় অংশ ব্যয় হয়।
টিসিবির চেয়ারম্যান বলেন, ‘টিসিবির মূল সমস্যা হলো, যে দামে পণ্য কেনা হয়, তার চেয়ে অনেক কম দামে বিক্রি করতে হয়। কিছু পণ্য কেনা দামের তুলনায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ কম দামে বিক্রি করা হয়। এর মধ্যে ভোজ্যতেলে ভর্তুকির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি।’
২০২২ সাল থেকে টিসিবি প্রতি লিটার ভোজ্যতেল ১০০ টাকায় বিক্রি করছে। অথচ বর্তমানে ডিলার কমিশন ও সংশ্লিষ্ট খরচসহ প্রতি লিটার তেল কিনতে প্রায় ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর সঙ্গে ব্যাংকঋণের সুদ যোগ করলে খরচ প্রায় ২০০ টাকায় দাঁড়ায়।
ব্যাংকঋণের সুদ কমাতে টিসিবি এখন ঋণপত্র (এলসি) ও ঋণপত্রের বিপরীতে ঋণ (এলটিআর) সুবিধার পরিবর্তে নগদ টাকায় চিনি ও মসুর ডাল কিনছে। এতে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ প্রায় ১৪ কোটি ১৯ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়েছে। একই সময়ে স্থানীয় বাজার থেকে নগদ টাকায় চিনি ও মসুর ডাল কেনায় এলসি চার্জ ও সংশ্লিষ্ট খরচ কমেছে প্রায় ৪২ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
টিসিবির চেয়ারম্যান জানান, সংস্থাটির বার্ষিক ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ বর্তমানে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। এই ব্যয় থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
ফয়সল আজাদ বলেন, ‘আমরা ঋণপত্র (এলসি) এবং ব্যাংক ও সরকারের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছি। যেখানে সম্ভব, নগদ টাকায় পণ্য কেনা হচ্ছে।’
এ ছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের তুলনায় ১ দশমিক ২৫ শতাংশ কম সুদে ঋণ সুবিধা পাওয়ায় বেসরকারি ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খোলা ও এলটিআর সুবিধা নেওয়া শুরু করেছে টিসিবি।
পণ্য বিক্রির টাকা দ্রুত সংস্থার ব্যাংক হিসাবে জমা নিশ্চিত করতে একটি অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) চালু করেছে টিসিবি। আগে এই টাকা জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) হিসাবের মাধ্যমে আসত। নতুন ব্যবস্থায় ডিলারদের কাছ থেকে বিক্রির টাকা দ্রুত টিসিবির হিসাবে জমা হবে। এতে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়বে এবং ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর না করে নগদ টাকায় পণ্য কেনা সহজ হবে।
ভর্তুকির বাইরেও আয় বাড়ানোর জন্য সাবান, ডিটারজেন্ট ও লবণকে বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে বাজারে এনেছে টিসিবি। এসব পণ্য প্রচলিত বাজারদরের চেয়ে কম দামে বিক্রি করা হলেও কেনা দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে ২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা মুনাফা করেছে সংস্থাটি।
আয়ের উৎস বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ফয়সল আজাদ বলেন, ‘শুধু ব্যয় কমিয়ে ভর্তুকির চাপ কমানো সম্ভব নয়। আমাদের আয়ও বাড়াতে হবে।’
পরিবহন, পণ্য ওঠানো-নামানোসহ অন্যান্য খরচ কমাতে পণ্য বিতরণব্যবস্থাতেও পরিবর্তন এনেছে টিসিবি। আগে আঞ্চলিক গুদাম থেকে পণ্য জেলা প্রশাসনের গুদামে পাঠানো হতো। এখন আঞ্চলিক গুদাম থেকেই সরাসরি পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
এ ছাড়া জরিপের কাজে পুনরাবৃত্তি ও অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি। টিসিবির চেয়ারম্যান জানান, জরিপ ও এ-সংক্রান্ত কাজে বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। একই ধরনের জরিপ বারবার করা বন্ধ করা গেলে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব।
তবে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়লে ভর্তুকির মোট পরিমাণও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন টিসিবির চেয়ারম্যান। বর্তমানে অতিরিক্ত পণ্যসহ টিসিবির কার্যক্রমের আওতায় প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ পণ্য কিনছেন। চলতি অর্থবছরে এই সংখ্যা ৭০ থেকে ৮০ লাখে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
ফয়সল আজাদ বলেন, ‘চলতি বছর ৮০ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারলে আগামী অর্থবছরে এক কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর আশা করছি।’
বর্তমানে ভর্তুকির আওতায় থাকা পণ্যের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই জানিয়ে টিসিবির চেয়ারম্যান বলেন, এসব পণ্য আগের দামেই বিক্রি হবে। পাশাপাশি নতুন বাণিজ্যিক পণ্যও যুক্ত করা হচ্ছে। তবে উপকারভোগীদের জন্য এসব পণ্য কেনা বাধ্যতামূলক নয়।
ফয়সল আজাদ বলেন, ‘উপকারভোগীরা চাইলে নতুন পণ্য কিনতে পারবেন। এসব পণ্য কেনা সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক। কাউকে তা কিনতে বাধ্য করা হবে না।’
টিসিবির চেয়ারম্যানের আশা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম থেকে আয় বাড়ানো, ঋণের সুদ ও পরিচালন ব্যয় কমানো এবং দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে ধীরে ধীরে সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এস এম/ ০২ নভেম্বর ২০২৬







