কাপ্তাই সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে ৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ

রাঙামাটি,১৩ অক্টোবর- নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনার অন্যতম উদাহরণ রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে গড়ে ওঠা দেশের প্রথম অনগ্রিড সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। সূর্যের আলো থেকে প্রতিদিন উৎপাদিত বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। প্রায় ৫০ বছর ধরে পড়ে থাকা পাহাড়ের পরিত্যক্ত জমিতে ৭ বছর আগে গড়ে ওঠা এই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। যার বাণিজ্যিক বাজারমূল্য প্রায় ৭৪ কোটি টাকা।
উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়াতে দুটি প্রকল্পের কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন রাঙামাটির কাপ্তাই কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান।
পরিত্যক্ত জমি কাজে লাগিয়ে রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে গড়ে ওঠা দেশের প্রথম অনগ্রিড সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির অন্যতম পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছে।
কাপ্তাই কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানান, ১৯৬২ সালে কাপ্তাই কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পর কাপ্তাই বাঁধের পাশে প্রায় ২২ একর জমি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। সেই জমির ১৯ একর জায়গায় প্রায় ১১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৯ সালে ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কাপ্তাই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়।
একসময় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকা সেই জমিতেই এখন সারি সারি সৌর প্যানেল বসানো হয়েছে। এই সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প শুধু পরিত্যক্ত জমির ব্যবহার নিশ্চিত করেনি, বরং সৌরশক্তির মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উৎপাদনের একটি নতুন উৎসও তৈরি করেছে। সূর্যের আলো থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত হচ্ছে।
কাপ্তাই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, এটি বেশ লাভজনক একটি প্রকল্প। এখানে জনবল ও পরিচালন ব্যয় অনেক কম। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মূলত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখলেই হয়। এ ছাড়া তেমন কোনো খরচ নেই। আবহাওয়া খারাপ থাকলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিছুটা কমে গেলেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না। পাহাড়ের পরিত্যক্ত এলাকায় এ ধরনের প্রকল্পের বিস্তার আরও বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে।
কাপ্তাই কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান আরও জানান, কাপ্তাই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে বর্তমান কেন্দ্রের সঙ্গে আরও ১ মেগাওয়াট ক্ষমতা যুক্ত করার পাশাপাশি নতুন ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াটের একটি প্রকল্পের কাজ চলছে।
তিনি জানান, তাদের ব্রিকফিল্ডে আরও একটি ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। এর দরপত্র প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছে। কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়াতে ১ মেগাওয়াট সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াটের প্রকল্পের কাজও বর্তমানে পুরোদমে এগিয়ে চলছে।
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে তেল, গ্যাস বা কয়লার প্রয়োজন হয় না। এই প্রকল্প প্রচলিত জ্বালানি, যেমন তেল, গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি করছে। সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরাসরি কোনো জ্বালানি পোড়াতে হয় না। ফলে একদিকে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশ রক্ষার সুযোগও বাড়ছে। এতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় হচ্ছে। বর্তমান সক্ষমতার পাশাপাশি কাপ্তাইয়ে সৌরবিদ্যুতের পরিধি আরও বাড়ানোর উদ্যোগও চলছে।
পরিত্যক্ত জমি কাজে লাগিয়ে কাপ্তাইয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের এই সাফল্য দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কাজে লাগানোর পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, কৃষিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং সোলার পার্ক স্থাপনে আরও বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাঙামাটির কাপ্তাই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের অন্যান্য অনাবাদি ও উপযুক্ত জমিতেও এ ধরনের প্রকল্প বাড়ানো গেলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এ জন্য এখন প্রয়োজন পরিকল্পিত বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি সহায়তার মাধ্যমে এ ধরনের উদ্যোগ সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া। এর ফলে জ্বালানি আমদানির চাপ কমানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ বাড়ানো সম্ভব হবে।
দেশের মোট ভূখণ্ডের এক-দশমাংশজুড়ে রয়েছে তিন পার্বত্য জেলা। এই অঞ্চলের বিশাল পাহাড়ি এলাকার যেসব জায়গা পরিত্যক্ত বা অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে, সেগুলোকে সরকারি উদ্যোগে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের আওতায় এনে কাজে লাগানো গেলে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করা সম্ভব।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে পাহাড়ের এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এখন প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ।
এস এম/ ১৩ অক্টোবর ২০২৬







