পুকুরে ‘জলপরী’ দেখার গুজব: নরসিংদীতে তোলপাড়, শত শত মানুষের ভিড় সামলাতে নামল প্রশাসন

নরসিংদী, ০৮ অক্টোবর – নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার আলালপুর গ্রামে একটি পুকুরে ‘জলপরী’ দেখা গেছে—এমন এক অবিশ্বাস্য গুজবকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে সৃষ্টি হয়েছে তুমুল তোলপাড়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রহস্যময় একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দূর-দূরান্ত থেকে শত শত উৎসুক মানুষ এক নজর ‘জলপরী’ দেখতে ভিড় জমায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, স্থানীদের কেউ কেউ পুকুরপাড় ঘিরে পূজা-অর্চনাও শুরু করেন। অবশেষে গুজব সামলাতে ঘটনাস্থলে নেমে পুরো পুকুরে জাল ফেলে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন আসল সত্য উন্মোচন করেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় রহস্যময় ভিডিও ও গুজবের সূচনা
জানা যায়, স্থানীয় এক কনটেন্ট নির্মাতা কয়েক দিন আগে ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে পানির উপরিভাগে কালো রঙের একটি অস্পষ্ট অবয়ব সাঁতার কাটতে দেখা যায়। এর পরেই ভিউ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণের লোভে সেটিকে ‘জলপরী’ বলে রটিয়ে দেওয়া হয়। পুকুরের মালিক কবির আহমেদ ভূঁইয়া পেশায় ব্যবসায়ী এবং ঢাকায় বসবাস করেন। পুকুরে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে রুই, কাতলা, মৃগেল ও সিলভার কার্পের চাষ করা হয়। অস্বাভাবিক লোকসমাগমের খবর পেয়ে তিনি গ্রামে এসে মনোহরদী উপজেলা প্রশাসনের শরণাপন্ন হন।
পুকুরে ফেলা হলো জাল: বেরিয়ে এলো আসল সত্য
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে পুলিশ ও প্রশাসন পুকুরে বড় জাল ফেলে অনুসন্ধান চালায়। পুরো পুকুর ছেঁকে ফেলার পর কেবল বিভিন্ন জাতের মাছ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়নি। ইউএনও মাহমুদুল হাসান জানান, “পুকুরে মাছের বিশাল ঝাঁক যখন একসঙ্গে সাঁতার কাটে, তখন দূর থেকে পানির ওপর বড় কোনো প্রাণীর নড়াচড়া বলে ভুল হতে পারে।” তিনি আরও জানান, অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম প্রযুক্তি (এআই) ও এডিটিংয়ের সাহায্যে ভিডিওটি তৈরি করে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিল। গুজব ছড়ানোর অপরাধে এক কনটেন্ট নির্মাতার কাছ থেকে মুচলেকাও নিয়েছে প্রশাসন।
কোথা থেকে এলো এই ‘জলপরী’ মিথ?
নরসিংদীর ঘটনাটি আধুনিক গুজবের ফসল হলেও ‘জলপরী’ বা ‘মৎস্যকন্যা’ (Mermaid) নিয়ে মানুষের অদম্য কৌতুহল হাজার বছরের পুরোনো। সমুদ্র ও তরুণী শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে সৃষ্ট এই কাল্পনিক চরিত্রের দেখা মেলে পৃথিবীর প্রায় সব প্রাচীন সভ্যতায়:
প্রাচীন ইতিহাস: মেসোপটেমীয় সভ্যতায় প্রায় ৫,০০০ বছর আগে পুরুষ মৎস্যদেবতা এবং খ্রিস্টপূর্ব ১,০০০ বছর আগে সিরিয়ায় দেবী ‘আতারগাতিস’-এর গল্পে প্রথম জলপরীর অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিশ্ব সংস্কৃতিতে অবস্থান: আফ্রিকায় ‘মামি ওয়াটা’, আয়ারল্যান্ডে ‘মেরোজ’, স্কটল্যান্ডে ‘সেলকি’ এবং গ্রিক মিথোলজির নাবিকদের প্রলুব্ধকারী ‘সাইরেন’—সবাই মৎস্যকন্যারই ভিন্ন ভিন্ন লোকজ রূপ।
সাহিত্য ও সিনেমা: ১৮ ৩৭ সালে ডেনিশ সাহিত্যিক হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসেনের ‘দ্য লিটল মারমেইড’ রূপকথা প্রকাশিত হওয়ার পর জলপরী চরিত্রটি বিশ্বজুড়ে অমরত্ব পায়, যা পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে ডিজনির বিখ্যাত অ্যানিমেটেড সিনেমার মাধ্যমে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুমুল জনপ্রিয় হয়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই যুগে এসেও ভিউ ও লাইকের আশায় অসাধু কনটেন্ট নির্মাতারা সাধারণ মানুষের অলৌকিক বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যেকোনো চমকপ্রদ ভিডিও বিশ্বাস করার আগে যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
এনএন/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬







