ইউরোপ

ইসরায়েলের আপত্তির মধ্যেও পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেটের কার্যক্রম

ব্রিটিশ কনস্যুলেটের কার্যক্রম

লন্ডন, ০৮ অক্টোবর-ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে নিজেদের কনস্যুলেটের কার্যক্রম সীমিত পরিসরে চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য।

এখন থেকে ভবনটি ‘ব্রিটিশ কনস্যুলেট জেনারেল’ নামে নয়, ‘ইউকে মিশন, জেরুজালেম’ নামে পরিচালিত হবে। তবে সেখানে ব্রিটিশ কূটনীতিকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হচ্ছে।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়েছে, পূর্ব জেরুজালেমের কনস্যুলেট জেনারেলের ভবনটি বন্ধ করা হচ্ছে না। বৃহস্পতিবার থেকেই এটি ‘ইউকে মিশন, জেরুজালেম’ নামে কার্যক্রম চালাবে।

মিলিব্যান্ড বলেন, নতুন কাঠামোর অধীনেও গুরুত্বপূর্ণ সেবা দেওয়া এবং ফিলিস্তিনি জনগণের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কাজ চালিয়ে যাওয়া হবে।

এর আগে ইসরায়েল যুক্তরাজ্যের কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিতে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্তের পর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক বিরোধ তীব্র হলে ইসরায়েল এই পদক্ষেপ নেয়।

সাত কূটনীতিক থাকছেন

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার বৃহস্পতিবার জানান, সীমিত পরিসরে ওই ভবন থেকে যুক্তরাজ্যের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে ইসরায়েল। সেখানে সাতজন ব্রিটিশ কূটনীতিক থাকবেন।

তবে ব্রিটিশ কনসাল জেনারেলসহ ২০ জন কূটনীতিক তাদের দায়িত্ব শেষ করে ইসরায়েল ছেড়ে যাবেন বলে জানান সার।

এরই মধ্যে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্সের সাংবাদিকেরা দেখতে পান, পূর্ব জেরুজালেমের ওই ভবন থেকে ‘ব্রিটিশ কনস্যুলেট জেনারেল’ লেখা ফলক সরিয়ে ফেলছেন কর্মীরা। কনস্যুলার বিভাগের আরেকটি সাইনবোর্ডও সরানো হয়। তবে তখনও ভবনটিতে ব্রিটিশ পতাকা উড়ছিল।

মিলিব্যান্ড বলেন, কনস্যুলেট বন্ধ করার আইনগত অধিকার ইসরায়েলের রয়েছে—এমন অবস্থান যুক্তরাজ্য মেনে নেয় না।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কয়েকজন কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পর এখন পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ উপস্থিতি আবার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বসতি ইস্যুতেই শুরু বিরোধ

পূর্ব জেরুজালেমের কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার ঘটনা মূলত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের নেওয়া পদক্ষেপের কারণে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ হিসেবে বিবেচনা করে জাতিসংঘ ও অধিকাংশ দেশ। তবে ইসরায়েল এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে।

যুক্তরাজ্য ইসরায়েলি বসতিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি ওইসব এলাকায় উৎপাদিত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরিকল্পনা করে। এর জবাবে ইসরায়েল গত ৮ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের নির্দেশ দেয়। বৃহস্পতিবার ওই নির্দেশের ৩০ দিন পূর্ণ হয়।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিয়ন সার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে তার উপযুক্ত পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে—এমন একটি নীতি তারা প্রতিষ্ঠা করেছে। তার ভাষায়, ওই নীতির ভিত্তিতেই কনস্যুলেটের কার্যক্রম সীমিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

পাল্টা ব্যবস্থা নিচ্ছে না লন্ডন

ইসরায়েলি কূটনীতিকদের বহিষ্কারসহ পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে যুক্তরাজ্য—এমন জল্পনা তৈরি হলেও আপাতত সে পথে যাচ্ছে না লন্ডন।

মিলিব্যান্ড জানান, দুই দেশ আলোচনায় থাকার সময়ে যুক্তরাজ্য ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো পাল্টা ব্যবস্থা নেবে না।

এর আগে কনস্যুলেটটি চালু রাখার চেষ্টা হিসেবে যুক্তরাজ্য তাদের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাকেও ইসরায়েলে পাঠিয়েছিল। গত সপ্তাহে তিনি ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেন। তবে ইসরায়েল এতদিন কনস্যুলেট বন্ধের অবস্থানেই অনড় ছিল।

প্রায় ২০০ বছরের ব্রিটিশ উপস্থিতি

পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কূটনৈতিক উপস্থিতির ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও বহু আগে থেকেই ওই এলাকায় ব্রিটিশ প্রতিনিধিত্ব ছিল।

বর্তমান কনস্যুলেটটি পূর্ব জেরুজালেমের শেখ জাররাহ এলাকায় অবস্থিত। এটি ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা করে না; সেই দায়িত্ব তেল আবিবে অবস্থিত ব্রিটিশ দূতাবাসের।

পূর্ব জেরুজালেমের কনস্যুলেট মূলত জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজা নিয়ে ব্রিটিশ কার্যক্রম এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য বিভিন্ন কনস্যুলার সেবা পরিচালনা করে।

১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেয় এবং এরপর থেকে অঞ্চলটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশ পূর্ব জেরুজালেমকে অধিকৃত ভূখণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে।

ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যেও টানাপোড়েন

কনস্যুলেট ইস্যুকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিলেও অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

পূর্ব জেরুজালেমে ব্রিটিশ কূটনৈতিক উপস্থিতি সীমিত করা হলেও পুরোপুরি বন্ধ না করার সিদ্ধান্তকে দুই দেশের চলমান আলোচনার একটি ফল হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন ‘ইউকে মিশন’ কাঠামোর মাধ্যমে যুক্তরাজ্য একদিকে ইসরায়েলের আপত্তির মধ্যেও কূটনৈতিক উপস্থিতি বজায় রাখছে, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে তাদের কার্যক্রম ও প্রয়োজনীয় কনস্যুলার সেবা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে।

এস এম/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language