মধ্যপ্রাচ্য

হরমুজ সংকটে তেল রফতানির বিকল্প পথ খুঁজছে ইরাক, তুরস্কের সঙ্গে আলোচনা

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ইরাক ও তুরস্কের কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা

বাগদাদ, ০৩ অক্টোবর-হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নের মধ্যে তেল রফতানির বিকল্প পথ খুঁজছে ইরাক। এরই অংশ হিসেবে তেল, গ্যাস ও জ্বালানি খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়াতে তুরস্কের সঙ্গে নতুন একটি কাঠামোগত চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে দেশটি।

শুক্রবার তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ইরাক ও তুরস্কের কর্মকর্তাদের মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়। বৈঠকে তেল ও গ্যাস খাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প, তেল-গ্যাস ও জ্বালানি বাণিজ্য এবং দুই দেশের যৌথ কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।

ইরাকের তেল মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বৈঠকে দুই দেশের তেল ও গ্যাস খাতের অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর একটি সম্ভাব্য রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প এবং তেল, গ্যাস ও জ্বালানি বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়ও আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষায় যৌথ কাজের কাঠামো ও সমন্বয় কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, তা নিয়েও কর্মকর্তারা আলোচনা করেছেন।

হরমুজ সংকটে বিকল্প রফতানি পথ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালিতে সংকটের কারণে ইরাক তার তেল রফতানি অবকাঠামো ও রফতানি করিডোরে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছে।

ইরাকের অর্থনীতির জন্য তেল রফতানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে উপসাগরীয় জলপথের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে স্থলপথে তেল পরিবহনের সুযোগ বাড়ানোকে গুরুত্ব দিচ্ছে বাগদাদ।

এরই ধারাবাহিকতায় গত আগস্টে ইরাক ও তুরস্ক এক বছরের একটি তেল পরিবহন চুক্তি সই করে। এর আগে দুই দেশের মধ্যে থাকা চুক্তিটির মেয়াদ জুলাইয়ের শেষ দিকে শেষ হয়ে যায়।

ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সালিম আল-রুকাবি ওই সময় নতুন চুক্তিটিকে ‘অস্থায়ী চুক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানিয়েছিলেন, এর আওতায় তেল রফতানি ধীরে ধীরে বাড়িয়ে পাইপলাইনের পূর্ণ সক্ষমতায় নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

আগস্টের শুরুতে ইরাকের তেলমন্ত্রীও জানিয়েছিলেন, সিরিয়া ও তুরস্ক হয়ে তেল রফতানি দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি করার পরিকল্পনা করছে বাগদাদ।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পথে দুই দেশ

তুরস্কের জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদমন্ত্রী আলপারসলান বায়রাকতার শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানান, তিনি তুরস্কের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে ইরাকের একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

আঞ্চলিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে উল্লেখ করে বায়রাকতার বলেন, তুরস্ক ও ইরাকের জ্বালানি সম্পর্ককে নতুন এবং আরও শক্তিশালী পর্যায়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

গত আগস্টে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস পাইপলাইন কোম্পানি বোটাস, ইরাকের রাষ্ট্রীয় তেল বিপণন সংস্থা সোমো এবং নর্থ অয়েল কোম্পানির মধ্যে অপরিশোধিত তেল পরিবহন চুক্তি সই হয়েছিল। ওই চুক্তির ভিত্তিতে এবার দুই দেশ নতুন, দীর্ঘমেয়াদি ও আরও বিস্তৃত একটি চুক্তির জন্য রূপরেখা তৈরি করছে বলে জানান বায়রাকতার।

তিনি বলেন, তেল ও গ্যাসের অবকাঠামো, অনুসন্ধান, বাণিজ্য, পরিশোধন, পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প এবং বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্প চূড়ান্ত করতে দুই দেশের যৌথ কর্মদলগুলো সক্রিয় করা হবে।

কিরকুক-জেহান পাইপলাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা

ইরাক-তুরস্ক জ্বালানি সহযোগিতার আলোচনায় কিরকুক-জেহান তেল পাইপলাইন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তুরস্কের মন্ত্রী বায়রাকতার জানিয়েছেন, পাইপলাইনটি দক্ষিণ ইরাকের বসরা পর্যন্ত সম্প্রসারণ এবং এর পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে আঙ্কারা।

তার মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতার একটি শক্তিশালী বিকল্প তৈরি হবে।

ইরাকের উত্তরাঞ্চলের কিরকুক তেলক্ষেত্র থেকে তুরস্কের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর জেহান পর্যন্ত এই পাইপলাইন ইরাকের তেল রফতানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এর মাধ্যমে স্থলপথে ইরাকি তেল আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বর্তমান সংকট অব্যাহত থাকলে এ ধরনের বিকল্প রফতানি করিডোর ইরাকের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে তুরস্কও মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পেতে পারে।

ফলে শুক্রবারের আলোচনা শুধু স্বল্পমেয়াদি তেল পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে নয়; বরং তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিশোধন ও পেট্রোকেমিক্যালসহ পুরো জ্বালানি খাতে ইরাক-তুরস্কের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ভিত্তি তৈরির উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

এস এম/ ০৩ অক্টোবর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language