জানা-অজানা

প্রযুক্তি ও পরিকল্পনায় চীনের স্বর্ণশিল্প এখন বিশ্বে শীর্ষে

চীনের স্বর্ণশিল্প

বেইজিং, ০২ সেপ্টেম্বর- চীন কীভাবে শিল্প খাতে বৈশ্বিক পরাশক্তি হয়ে উঠেছে, তা বোঝার জন্য দেশটির সোনা শিল্পের উত্থানের গল্পের চেয়ে বড় উদাহরণ আর হতে পারে না।

হাজার বছর ধরে চীনে সোনার প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকলেও ঐতিহাসিকভাবে দেশটির অর্থনীতি কখনোই সোনাভিত্তিক ছিল না। এর অন্যতম কারণ ছিল, চীনের মাটির নিচে প্রাকৃতিক স্বর্ণের মজুদ খুব বেশি ছিল না। ১৯৭৫ সালে, যখন চীন অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের পথে যাত্রা শুরু করে, তখন সংস্কারের অর্থায়ন এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে দেশটির সোনার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সে সময় চীন বছরে মাত্র ১৩ দশমিক ৮ মেট্রিক টন সোনা উৎপাদন করতে পারত। তখন বিশ্ববাজারে আধিপত্য ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা, কানাডা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার এবং উৎপাদনের দিক থেকে তারা চীনের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল।

তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। ২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ছাড়িয়ে চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়। এরপর থেকে শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছে দেশটি। বর্তমানে চীন বছরে ৩৮০ মেট্রিক টন সোনা উৎপাদন করে, যা দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া ও মেক্সিকোর সম্মিলিত উৎপাদনের চেয়েও বেশি।

চীনের এই সাফল্য অবশ্য কোনো অলৌকিক ঘটনার ফল নয়।

১৯৭৯ সালে বেইজিং ‘গোল্ড ট্রুপ’ গঠন করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাটির নিচে সোনার সন্ধানে বাহিনী পাঠিয়েছিল। কিন্তু সেখানে উচ্চমানের স্বর্ণখনির সন্ধান পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত চীনের ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, রাষ্ট্রীয় শিল্পনীতি এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা।

১৯৯০-এর দশক থেকে চীনের রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো নিম্নমানের আকরিক প্রক্রিয়াজাত করার জন্য ‘প্রেসার অক্সিডেশন’ নামে একটি জটিল প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করতে শুরু করে। সহজভাবে বললে, প্রতি এক টন পাথরে মাত্র ১ গ্রাম সোনা থাকলেও এই প্রযুক্তির মাধ্যমে খনি শ্রমিকরা তা লাভজনকভাবে বের করতে সক্ষম হন।

এর ফলে চীনের বিশাল এবং এতদিন অবহেলিত নিম্নমানের স্বর্ণক্ষেত্রগুলো নতুন সম্পদে পরিণত হয়। বর্তমানে দেশটির মোট স্বর্ণ উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ প্রায় ১৩০ মেট্রিক টন, এসব নিম্নমানের খনি থেকে আসে।

মজার বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি চীন নিজে আবিষ্কার করেনি এবং সবচেয়ে বড় প্ল্যান্টও তারা তৈরি করেনি। প্রযুক্তিটির উদ্ভাবক যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা, আর সবচেয়ে বড় সুযোগ-সুবিধা রয়েছে রাশিয়ায়। তারপরও পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের কারণে এই ক্ষেত্রে চীন বিশ্বে নেতৃত্ব দিচ্ছে।

আমেরিকায় প্রায় ৭৫ শতাংশ সোনা একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে আসে। কিন্তু চীন এ ধরনের একক অঞ্চলের ওপর নির্ভর না করে সারা দেশে শত শত মাঝারি আকারের খনি ক্লাস্টার পরিচালনা করে। ফলে কোনো একটি দুর্ঘটনায় পুরো উৎপাদনব্যবস্থা অচল হয়ে যায় না। দক্ষিণ আফ্রিকার খনিগুলোর তুলনায় চীনের খনিগুলোও রাষ্ট্রীয়ভাবে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। উৎপাদন, অর্থায়ন, পরিবহন থেকে শুরু করে নিরাপত্তা—সবকিছুই একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। অর্থাৎ চীন শুধু বড় বড় কারখানা তৈরি করেনি, বরং পুরো একটি শিল্প ‘ইকোসিস্টেম’ গড়ে তুলেছে।

এর পাশাপাশি তামা, সীসা ও দস্তার মতো অন্যান্য ধাতু পরিশোধনের সময় উপজাত হিসেবেও চীন বছরে প্রায় ৮০ মেট্রিক টন সোনা উদ্ধার করে। এই পরিমাণ কাজাখস্তানের মতো একটি দেশের পুরো এক বছরের স্বর্ণ উৎপাদনের সমান।

২০১৬ সালে চীন রেকর্ড ৪৫৩ দশমিক ৫ মেট্রিক টন সোনা উৎপাদন করেছিল। তবে সে সময় স্থানীয় সরকারগুলো পরিবেশের তুলনায় উৎপাদনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় দূষণ গুরুতর আকার ধারণ করে। ২০১৭ সাল থেকে বেইজিং পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর নিয়ম চালু করে এবং হাজার হাজার অবৈধ ও দূষণকারী খনি বন্ধ করে দেয়। এতে উৎপাদন কিছুটা কমলেও দেশটির স্বর্ণ খাত আরও পরিচ্ছন্ন, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে।

২০০৭ সাল থেকে বিশ্বের শীর্ষ স্বর্ণ উৎপাদক হওয়া সত্ত্বেও চীন থেমে নেই। দেশটি প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সোনা আমদানি করছে। নিজস্ব উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে চীন বছরে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন সোনা নিজেদের ভল্টে জমা করছে।

তবে বেইজিং শুধু সোনার চকচকে মূল্য বা সৌন্দর্যের জন্য এটি জমাচ্ছে না। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক পরিকল্পনা। চীনা মুদ্রা ইউয়ানকে বৈশ্বিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার লক্ষ্যেই বেইজিং সোনা মজুতের এই নীতি গ্রহণ করেছে।

এস এম/ ০২ অক্টোবর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language