জানা-অজানা

ফ্রান্সিস হালজেনের ধারণায় দক্ষিণ মেরুর বরফে নিউট্রিনো শনাক্ত, খুলেছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত

ফ্রান্সিস হালজেন

স্টকহোম, ০৬ অক্টোবর-আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক উৎস থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ ফ্রান্সিস হালজেন ২০২৬ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। নোবেলজয়ী ফ্রান্সিস হালজেন নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন একটি দিগন্ত উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।

তার ধারণার ভিত্তিতে দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে নিউট্রিনো শনাক্তের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এরই ফল হলো ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’। এর মাধ্যমে সুদূর মহাবিশ্ব থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করা এবং তাদের উৎস সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।

নিউট্রিনো মহাবিশ্বের অন্যতম রহস্যময় কণা।

এর কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই এবং এর ভরও অত্যন্ত কম। তাই সাধারণত নিউট্রিনো কোনো বাধা ছাড়াই পদার্থের মধ্য দিয়ে চলে যায়। খুবই বিরল ক্ষেত্রে কোনো নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ালে সেটিকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

প্রতি সেকেন্ডে সূর্য থেকে আসা প্রায় ৬৫ বিলিয়ন নিউট্রিনো আমাদের কনিষ্ঠ আঙুলের নখের ওপর দিয়ে চলে যায়।

মহাবিশ্বের বিভিন্ন দূরবর্তী উৎস থেকেও নিউট্রিনো আসে। এসব মহাজাগতিক নিউট্রিনো শনাক্ত করে বিজ্ঞানীরা এগুলোর উৎপত্তিস্থলের চরম পরিবেশ এবং মহাবিশ্বের নানা রহস্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারেন।

বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই জানতে পেরেছেন, মহাবিশ্বে এমন কিছু প্রাকৃতিক কণা ত্বরণযন্ত্র রয়েছে। এগুলো পৃথিবীর গবেষণাগারে তৈরি করা সম্ভব এমন শক্তির চেয়েও প্রায় ১০ লাখ গুণ বেশি শক্তিসম্পন্ন কণা উৎপন্ন করে।

তবে এসব মহাজাগতিক উৎস এখনো অনেকটাই রহস্যময়।

এগুলো কী, কোথায় অবস্থিত এবং কীভাবে এত শক্তিশালী কণা তৈরি করে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

অত্যন্ত উচ্চশক্তির নিউট্রিনো অন্যান্য কণার মতো একই মহাজাগতিক পরিবেশে তৈরি হয়। তবে অন্য কণার তুলনায় নিউট্রিনো মহাকাশে চলার সময় সহজে দিক পরিবর্তন করে না বা শক্তি হারায় না। ফলে এগুলো প্রায় সরাসরি তাদের উৎস থেকে পৃথিবীতে পৌঁছায়। এ কারণে নিউট্রিনো মহাবিশ্বের দূরবর্তী ও শক্তিশালী উৎস সম্পর্কে এমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে, যা অন্য কোনো কণার মাধ্যমে পাওয়া কঠিন।

নোবেলজয়ী ফ্রান্সিস হালজেন ১৯৮৮ সালে দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহার করে নিউট্রিনো শনাক্তের পরিকল্পনা প্রথম তুলে ধরেন। কোনো নিউট্রিনো পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে সংঘর্ষ করলে যে ক্ষীণ আলোর ঝলক তৈরি হয়, তা স্বচ্ছ বরফের মধ্যে স্থাপিত বিশেষ সেন্সরের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়।

দক্ষিণ মেরুর বরফ এ গবেষণার জন্য উপযোগী। কারণ সেখানে বাইরের নানা ধরনের হস্তক্ষেপ কম এবং অঞ্চলটি ভূতাত্ত্বিকভাবে স্থিতিশীল। হালজেনের এই ধারণা দ্রুত অন্য গবেষকদের সমর্থন পায়। কয়েক বছরের মধ্যেই বরফের মধ্যে সেন্সর স্থাপন করে প্রাথমিক পরীক্ষা শুরু হয়।

রহস্যময় কণা নিউট্রিনো শনাক্ত করা হচ্ছে যেভাবে

১৯৮০-এর দশকে মহাজাগতিক কণা নিয়ে কাজ করার সময় ফ্রান্সিস হালজেন জানতে পারেন, সোভিয়েত গবেষকেরা অ্যান্টার্কটিকায় রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে নিউট্রিনো শনাক্ত করার পরিকল্পনা করছেন।

তাদের ধারণা ছিল, বরফের পরমাণুর সঙ্গে নিউট্রিনোর সংঘর্ষ হলে রেডিও তরঙ্গ তৈরি হতে পারে এবং তা অ্যান্টেনার সাহায্যে শনাক্ত করা সম্ভব। এই ধারণা থেকে হালজেন নতুন একটি পদ্ধতির কথা ভাবেন। তিনি প্রস্তাব করেন, বরফের গভীরে আলোক সংবেদক বসিয়ে নিউট্রিনোর সংঘর্ষে তৈরি ক্ষীণ আলোর ঝলক শনাক্ত করা যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে তার এই ধারণার ভিত্তিতেই গড়ে ওঠে আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি।

হালজেন বুঝতে পেরেছিলেন, ভৌগোলিক দক্ষিণ মেরুতে নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণাগার স্থাপনের অনেক সুবিধা রয়েছে। সেখানে আগে থেকেই একটি গবেষণা কেন্দ্র ছিল। ফলে গবেষকদের যাতায়াত, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পরিবহন এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা পাওয়া সহজ ছিল।

পর্যবেক্ষণাগার তৈরির জন্য বরফও উপযোগী। বরফের অনেক গভীরে সব সময় অন্ধকার থাকে। সমুদ্রের মতো সেখানে কোনো জীবজন্তুর কারণে বাড়তি বাধা বা সংকেতের সমস্যা নেই এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থের পরিমাণও খুব কম। বরফ স্থিতিশীল হওয়ায় গবেষণার সরঞ্জাম স্থাপন ও কাজ করাও সহজ। এ ছাড়া দক্ষিণ মেরু ভূতাত্ত্বিকভাবে স্থিতিশীল এবং সেখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নেই।

হালজেনের এই ধারণা দ্রুতই গবেষকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করে। কয়েক বছরের মধ্যেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে অ্যান্টার্কটিকায় নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণাগার তৈরির কাজ শুরু করেন।

প্রথমে বরফের গভীরে যন্ত্র বসানোর প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধান করতে হয়। গবেষকেরা গরম পানি ব্যবহার করে কিলোমিটার গভীর বরফে গর্ত খোঁড়ার একটি পদ্ধতি তৈরি করেন। এরপর সেই গর্তে আলোক সংবেদকযুক্ত লম্বা তার নামিয়ে দেওয়া হয়। এসব সংবেদক নিউট্রিনোর সংঘর্ষে তৈরি ক্ষীণ আলোর ঝলক শনাক্ত করে তা বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে।

ভবিষ্যতে আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি থেকে গবেষকরা কী জানতে চান?

মহাজাগতিক নিউট্রিনোর উৎস শনাক্ত করা আইসকিউবের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। গবেষকেরা এখন পর্যন্ত কয়েকটি সম্ভাব্য উৎসের সন্ধান পেয়েছেন। এর মধ্যে একটি হলো সক্রিয় ছায়াপথ এনজিসি ১০৬৮, যা এম৭৭ নামেও পরিচিত। আইসকিউবে শনাক্ত ৭৯টি নিউট্রিনো এই ছায়াপথের দিক থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এনজিসি ১০৬৮-ই যে এসব নিউট্রিনোর উৎস, তা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

গবেষকেরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে আরও বেশি নিউট্রিনো শনাক্ত হলে তাদের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইসকিউবের গবেষকেরা আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ মিল্কিওয়ে থেকেও উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করেছেন। তাদের ধারণা, মহাজাগতিক রশ্মি নক্ষত্রগুলোর মধ্যবর্তী গ্যাসের পরমাণুর সঙ্গে সংঘর্ষ করলে এসব নিউট্রিনো তৈরি হতে পারে।

আগামী বছরগুলোতে নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ‘আইসকিউবে’র পথ অনুসরণ করে উত্তর গোলার্ধে কয়েকটি নতুন নিউট্রিনো টেলিস্কোপ তৈরি হচ্ছে। এসব টেলিস্কোপ বরফের পরিবর্তে পানির নিচে স্থাপন করা হবে। ১৯৮০-এর দশকে ফ্রান্সিস হালজেনকে অনুপ্রাণিত করা ‘ডুমান’ প্রকল্পটি ১৯৯৫ সালে বন্ধ হয়ে যায়।

তবে এর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বৈকাল হ্রদ, ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণ চীন সাগর ও কানাডার পশ্চিম উপকূলে নতুন নিউট্রিনো পর্যবেক্ষণ প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এদিকে আইসকিউব নিয়মিত নিউট্রিনো শনাক্ত করে যাচ্ছে। দক্ষিণ মেরুতে এর আরও বড় সংস্করণ ‘আইসকিউব-জেন২’ নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এতে প্রায় ৮ ঘনকিলোমিটার বরফজুড়ে নিউট্রিনো শনাক্তের ব্যবস্থা থাকবে।

এস এম/ ০৬ অক্টোবর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language