উত্তর আমেরিকা

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার, তবে কাটছে না দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংকট

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার

ওয়াশিংটন, ০২ অক্টোবর- মার্কিন বাহিনীর দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতি এবং ইরাক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতির শেষটা বড় ধরনের ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে হচ্ছে। ওয়াশিংটন যখন প্রথম ইরাকে তাদের এই বিশাল রাজনৈতিক ও সামরিক প্রকল্প শুরু করেছিল, তখন দেশটিতে যে ধরনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তা ছিল, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সেনা প্রত্যাহারের পরও ইরাক অনেকটা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের চূড়ান্তভাবে বিদায় নেওয়া যেমন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত একটি রাজনৈতিক মাইলফলক, তেমনি এর মধ্য দিয়ে দেশটির দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ ক্ষতও মিটে যাচ্ছে না। মার্কিন হস্তক্ষেপের কারণে তৈরি ক্ষমতার বিভাজন, গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক অনাস্থা এবং একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা আরও বহু বছর ইরাকের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাব ফেলবে।

২০০৩ সালের মার্চে ইরাকে হামলার মধ্য দিয়ে আমেরিকা দেশটির শাসনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র থাকার অজুহাতে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তেমন কোনো অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায়নি। খুব দ্রুত সাদ্দাম সরকারের পতন হলেও নতুন ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা আমেরিকার সামরিক সক্ষমতার পক্ষে সম্ভব হয়নি। যুদ্ধের পর ইরাকি সেনাবাহিনী বিলুপ্ত করা এবং সাদ্দামের বাথ পার্টির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যাপকভাবে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেশটির প্রশাসনিক ও সামাজিক ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়। হাজার হাজার সামরিক ও বেসামরিক পেশাজীবী এক রাতের মধ্যে কর্মহীন ও কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এর ফলে যে ক্ষোভ তৈরি হয়, তা সশস্ত্র প্রতিরোধে রূপ নেয় এবং ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক সংঘাতকে উসকে দেয়। এই সিদ্ধান্তের কারণে তৈরি হওয়া শূন্যতা পরে দেশটিকে আরও বেশি সহিংসতার দিকে ঠেলে দেয়।

পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। তবে এর সব দায় শুধু মার্কিন সিদ্ধান্তের ওপর চাপানোও যুক্তিসঙ্গত হবে না। ইরাকের স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারাও ক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ দলীয় বা গোষ্ঠীগত ভিত্তিতে ভাগ করে নিয়েছিলেন, যার ফলে সমাজের একটি বড় অংশ মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোও বাগদাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে। তারপরও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হওয়ার আগেই ওয়াশিংটন পুরোনো কাঠামো ভেঙে ফেলায় ইরাকজুড়ে বিভিন্ন সশস্ত্র ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। পরে ২০১১ সালে আমেরিকা প্রথম দফায় সেনা প্রত্যাহার করলেও ২০১৪ সালে আইএসের উত্থানের সময় বাগদাদের অনুরোধে আবার তাদের ফিরে আসতে হয়। সে সময় আইএসের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলা, গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে স্থলভাগের মূল লড়াই করেছে ইরাকি সেনাবাহিনী, কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, পেশমার্গা এবং পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস বা হাসদ আল-শাবি।

২০১৭ সালে আইএসের আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ ধ্বংস হওয়া ছিল বড় একটি সামরিক অর্জন। কিন্তু যে সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণগুলো এই চরমপন্থী গোষ্ঠীর জন্ম দিয়েছিল, তার স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। আমেরিকা যে নিরাপদ ও স্থিতিশীল ইরাক গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করেছিল, তা সফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাদের তৈরি করা হুমকি তারাই দমন করে বিদায় নিচ্ছে। এর আঞ্চলিক প্রভাবও ছিল জটিল। যে ইরানকে ঠেকানোর উদ্দেশ্যে আমেরিকা পদক্ষেপ নিয়েছিল, সাদ্দাম সরকারের পতন শেষ পর্যন্ত সেই দেশটিকেই ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব বাড়ানোর বড় সুযোগ করে দেয়। বিপুল অর্থ ও সম্পদ ব্যয় করার পরও শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের অবস্থানই বাগদাদে সবচেয়ে শক্ত হয়েছে।

বর্তমানে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘটনাকে ইরাকি সমাজের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের অবসান হিসেবে দেখছে। যদিও ২০১৪ সালের পর মার্কিন উপস্থিতি আইনিভাবে ইরাক সরকারের সরাসরি আমন্ত্রণেই ছিল, তবু বাগদাদের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং যুদ্ধ ও শান্তির মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো রাষ্ট্রের একক নিয়ন্ত্রণে রাখা। বিশেষ করে ২০১৪ সালে গঠিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের মতো বড় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে পুরোপুরি সরকারের অধীনে আনা একটি জটিল রাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। কারণ, এই গোষ্ঠীর অনেক বাহিনী নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে। ফলে সরকারের অর্থায়ন নিলেও তারা রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বা নির্দেশ মেনে চলতে রাজি নয়।

প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির নেতৃত্বাধীন বর্তমান ইরাকি সরকার সব ধরনের অস্ত্র রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার জোর চেষ্টা করছে। তবে কতাইব হিজবুল্লাহর মতো শক্তিশালী ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই নির্দেশের সরাসরি বিরোধিতা করছে। তাদের যোদ্ধাদের গ্রেপ্তার বা নিরস্ত্র করার উদ্যোগ নেওয়া হলে এরই মধ্যে পাল্টা প্রতিশোধের হুমকি এসেছে। আমেরিকা, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে বাড়তে থাকা উত্তেজনার মধ্যে এসব গোষ্ঠী নিজেদের প্রতিরক্ষা এবং তেহরানের স্বার্থ রক্ষার জন্য এই অস্ত্রকে একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। ফলে বাগদাদ প্রশাসন এখন ওয়াশিংটনের চাপ এবং তেহরানের কূটনৈতিক প্রত্যাশার মধ্যে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে একসঙ্গে নিরস্ত্র করতে গেলে সরকারবিরোধী ঐক্য তৈরি হতে পারে। আবার তাদের ক্ষেত্রে নমনীয়তা দেখালে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব শুধু একটি ফাঁকা স্লোগান হয়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

মার্কিন বাহিনী চলে যাওয়ার পর অনেকে ২০১৪ সালের মতো নতুন কোনো শক্তিশূন্যতা তৈরি হওয়া এবং আইএসের পুনরুত্থানের আশঙ্কা করছেন। তবে বর্তমানে ইরাকি সেনাবাহিনীর সক্ষমতা ও পেশাদারিত্ব আগের চেয়ে অনেক উন্নত। ২০২৫ সালে সশস্ত্র বাহিনীর অব্যাহত অভিযানের কারণে আইএসের হামলা ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। তারপরও এই জিহাদি সংগঠনের গোপন নেটওয়ার্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি এবং তারা প্রতিবেশী সিরিয়ার অস্থিতিশীলতার সুযোগ নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। ইরাকি সরকারের সঙ্গে দেশের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বড় কোনো সংঘাত তৈরি হলে এবং সেনাবাহিনীর মনোযোগ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধ সামলানোর দিকে চলে গেলে, তখনই আইএসের মতো গোষ্ঠীগুলো আবার মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বাগদাদ, কুর্দি কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব রয়েছে, সেসব এলাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে।

অন্যদিকে, আমেরিকা ইরাক থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে নেয়নি। ওয়াশিংটন মূলত তাদের কৌশলগত অগ্রাধিকার নতুন করে মূল্যায়ন করছে। আমেরিকা এখন ল্যাটিন আমেরিকা, উত্তর আটলান্টিক ও গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে নতুন একটি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে এরবিলে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলা বা ইতালীয় বাহিনীর ওপর হামলার মতো ঘটনা দেখিয়েছে, এই অঞ্চলে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং মার্কিন সেনাদের স্থায়ী উপস্থিতি ওয়াশিংটনের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছিল। তুলনামূলক কম খরচের একটি ড্রোন দিয়ে মূল্যবান সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো সম্ভব হওয়ায় আমেরিকার জন্য এ ধরনের মোতায়েন আর লাভজনক বা কার্যকর থাকছে না।

আমেরিকান সেনাদের সামরিক ইউনিটগুলো বিদায় নিলেও এই অভিযানের রাজনৈতিক দায় থেকে ওয়াশিংটন মুক্ত হতে পারছে না। তারা ইরাককে এমন এক সংকটপূর্ণ সময়ে রেখে যাচ্ছে, যখন রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নেই এবং স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতাও এখনো অধরা। আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরোপুরি সরে না গেলেও যেখানে বিশাল সামরিক উপস্থিতির বিনিময়ে রাজনৈতিক সুফল মিলছে না, সেখান থেকে কৌশলগতভাবে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে। এখন বাগদাদ নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে একটি কার্যকর সরকার গঠন করতে পারবে কি না, নাকি মার্কিন বিদায়ের পর তৈরি হওয়া শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে ইরাক আবার গৃহযুদ্ধ ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতে জড়িয়ে পড়বে, তার ওপরই দেশটির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

এস এম/ ০২ অক্টোবর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language