হরমুজ প্রণালিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৮ মার্কিন মেরিন আহত

ওয়াশিংটন, ২৮ সেপ্টেম্বর- পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত আট মার্কিন মেরিন সেনা আহত হয়েছেন। চলতি মাসের শুরুর দিকে এই ঘটনা ঘটলেও এতদিন তা পেন্টাগনের নজরের বাইরে ছিল। সম্প্রতি মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে, একটি জলযানে অবস্থান করার সময় ইরানের নৌ-বিধ্বংসী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ওই সেনারা আহত হন। আহতদের মধ্যে সাতজন সাধারণ সেনা এবং একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। ক্ষেপণাস্ত্রের বিস্ফোরণ ও পরে তৈরি হওয়া ধোঁয়ার কারণে তারা ধোঁয়াজনিত শ্বাসকষ্ট এবং সম্ভাব্য ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরিতে ভুগছেন। তবে কারও আঘাতই আশঙ্কাজনক নয় বলে জানা গেছে। ঘটনার প্রায় ১০ দিন পার হয়ে গেলেও মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। পরে চুপিসারে পেন্টাগনের অফিসিয়াল ‘ডিফেন্স ক্যাজুয়াল্টি অ্যানালাইসিস সিস্টেম’ ডাটাবেজে ওই আট মেরিন সেনার নাম যুক্ত করা হয়।
ইরানের সঙ্গে চলমান এই সংঘাতের শুরু থেকেই ওয়াশিংটন হতাহতের সঠিক সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব গোপন করার চেষ্টা করছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর পক্ষ থেকে সমালোচনা শুরু হয়েছে। শুধু আহতদের তথ্য নয়, প্রাণহানির সংখ্যাও গোপন করার অভিযোগ উঠেছে। কিছুদিন আগে আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮ জন সেনা নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও সংঘাত শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ২২ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া গত সপ্তাহে কোনো স্পষ্ট কারণ না জানিয়েই পেন্টাগনের আহতদের তালিকায় নতুন করে ৩৭ জনের নাম যোগ করা হয়। এতে ইরান যুদ্ধে আহত মার্কিন সেনার স্বীকৃত সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৬১ জনে। তবে বিতর্ক এড়াতে পেন্টাগন এসব সেনার অর্ধেকের বেশি সদস্যকে সরাসরি ইরান যুদ্ধের শিকার হিসেবে না দেখিয়ে কৌশলগতভাবে দূরবর্তী অভিযানের ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত করেছে।
এত তথ্য গোপন করার পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, নাকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তথ্যের এই হেরফের হচ্ছে, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। তবে পেন্টাগন প্রধান বা যুদ্ধ সচিব পিট হেগসেথ গণমাধ্যমের এসব অনুসন্ধানী প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ ‘বানোয়াট ও জঘন্য অপপ্রচার’ বলে এক বাক্যে উড়িয়ে দিয়েছেন। শুধু মানবসম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নয়, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বড় ধরনের আর্থিক ব্যয় নিয়েও মার্কিন প্রশাসনের স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ড বা সেন্টকমের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ইরান সামরিক অভিযানের খরচ আনুমানিক ৪৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার ধরা হয়েছে। তবে এতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির হিসাব যুক্ত করা হয়নি। অথচ গত জুলাইয়ে প্রকাশিত পেন্টাগনের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে দেখা যায়, ধ্বংস হওয়া যুদ্ধবিমান প্রতিস্থাপন, ঘাঁটি সংস্কার এবং বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ আবার মজুত করার খরচসহ যুদ্ধের প্রকৃত ব্যয় ইতোমধ্যে ৮০ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই অব্যাহত চাপের মধ্যেও ইরান পিছু হটতে রাজি নয়। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, ওয়াশিংটন সামরিক উসকানি ও আগ্রাসন বন্ধ না করলে সামনে তাদের জন্য আরও তিক্ত ও ‘অবিস্মরণীয় শিক্ষা’ অপেক্ষা করছে। এর ফলে মার্কিনদের আরও বড় আর্থিক ও মানবসম্পদের মূল্য দিতে হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আবারও বলেছেন, তেহরান কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অহেতুক যুদ্ধ কিংবা মার্কিন সেনা হত্যা করতে চায় না। তবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বাইরের মার্কিন চাপ মোকাবিলায় ইরান শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাবে।
এস এম/ ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬







