মধ্যপ্রাচ্য

জাতিসংঘ অধিবেশনে কূটনৈতিক তৎপরতায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী

জাতিসংঘ অধিবেশনে কূটনৈতিক তৎপরতায় ইরান

তেহরান, ২৬ সেপ্টেম্বর- গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছিলেন। ওই হামলায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও মারা যেতে পারতেন। ওই হামলা থেকেই যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তা এখনো চলছে। কিন্তু ইরানের শীর্ষ নেতারা এ সপ্তাহে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের নিরাপত্তায় ম্যানহাটনের রাস্তায় হেঁটেছেন। দেশে থাকলে যাদের প্রায়ই বোমা হামলার ভয়ে শেল্টারে আশ্রয় নিতে হতো।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী কূটনৈতিক সুবিধার পুরোপুরি ব্যবহার করেছেন। বিশ্বমঞ্চে তারা নিজেদের বক্তব্য জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। তারা ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা একটি দেশ হিসেবে এবং অপর পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনকারী ‘দস্যু’ হিসেবে তুলে ধরেছেন।

নিউইয়র্কে আব্বাস আরাগচি দুই ডজনের বেশি কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এর মধ্যে ১০টির বেশি ইউরোপীয় দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। এই তালিকায় জর্ডানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ছিলেন, যে দেশে ইরান এর আগে হামলা চালিয়েছিল। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে একটি বিরল সরাসরি বৈঠক করেছেন এবং পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ইরান আলোচনার টেবিলে একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে।

জাতিসংঘের অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে পেজেশকিয়ান বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান কখনোই ‘মাথা নত করবে না।’ তার এই বক্তব্য দেশের ভেতরে থাকা কট্টরপন্থীদের মন জয় করেছে। অথচ যুদ্ধকালীন নিষেধাজ্ঞা ও মার্কিন নৌ-অবরোধে ইরানের অর্থনীতি যখন বিপর্যস্ত, তখন এই কট্টরপন্থীদের একাংশই তার এই সফরের বিরোধিতা করেছিল।

গত বৃহস্পতিবার পেজেশকিয়ান নিউইয়র্কের একটি হোটেলে পশ্চিমা সাংবাদিক ও থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন এবং তার সরকারের চিন্তাভাবনা তুলে ধরেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির সেই সকালের পরিস্থিতির সঙ্গে এটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র। সেদিন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মধ্যে কয়েক ঘণ্টা নিখোঁজ থাকার পর তার মৃত্যুর আশঙ্কা করা হচ্ছিল।

গত কয়েক দশকেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইরানের উপস্থিতি মনোযোগ কেড়েছে। তবে যুদ্ধের ছায়ায় ঘেরা এবারের সফরটি প্রধান আকর্ষণ বা মূল ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। তেহরানের কর্মকর্তারা বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ—দুই দিকের মনোযোগের কথা মাথায় রেখে অত্যন্ত কৌশলগতভাবে এই সফরের পরিকল্পনা করেছিলেন।

ইরানের কট্টরপন্থীরা শুরুতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পেজেশকিয়ান ও আরাগচির এই কূটনৈতিক উদ্যোগের সমালোচনা করেছিলেন। যে দেশ তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ চালাচ্ছে, সেই দেশে সফরের সিদ্ধান্তকে তারা আত্মসমর্পণের লক্ষণ হিসেবে দেখেছিলেন। বিশেষ করে আরাগচি মার্কিন দূত উইটকফের সঙ্গে বৈঠক করায় ইরানের রক্ষণশীল আইনপ্রণেতাদের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েন।

রাজনৈতিক ভুলের বড় ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ইরানি কর্মকর্তারা এমন একটি সফর সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন, যা দেশের ভেতরে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে, প্রতিপক্ষের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার পথ আবার সচল করেছে, বিশ্বের কাছে নিজেদের টিকে থাকার বার্তা দিয়েছে এবং আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছে তাদের চিন্তাভাবনা পৌঁছে দিয়েছে।

পেজেশকিয়ান জাতিসংঘের মঞ্চ থেকে ইরানের দাবিগুলো তুলে ধরেন এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। অন্যদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে যৌথভাবে যুদ্ধ শুরু করা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন জাতিসংঘের মঞ্চে বক্তব্য দিতে ওঠেন, তখন নিউইয়র্কের রাস্তায় তীব্র বিক্ষোভের পাশাপাশি জাতিসংঘে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা দলে দলে ওয়াকআউট করেন।

এস এম/ ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language