লোহিত সাগরে হুতিদের তৎপরতা ঠেকাতে ইরানের ওপর চীনের চাপ

বেইজিং,১৮ সেপ্টেম্বর- ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা ও দ্রুত অগ্রযাত্রার কারণে লোহিত সাগর অঞ্চলের সার্বিক নিরাপত্তা এবং সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানি বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়েছে। লোহিত সাগরের উপকূল এবং গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মানদেব প্রণালির আশপাশে হুতিদের আকস্মিক আধিপত্য বিস্তারের পর গভীর উদ্বেগ জানিয়ে চীনের কাছে সাহায্য চেয়েছে রিয়াদ।
সৌদির এই জরুরি আবেদনের পর তেহরানের ওপর ‘গোপন কূটনৈতিক চাপ’ তৈরি করেছে বেইজিং। তেহরান যেন নিজেদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে হুতিদের সামরিক অভিযান ও হামলা থেকে বিরত রাখে, সে বিষয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে কড়া বার্তা দিয়েছে চীন। বিষয়টি সম্পর্কে সরাসরি জানেন এমন তিনটি ইরানি সূত্র থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার বড় একটি অংশ এই অঞ্চলের নৌপথের ওপর নির্ভরশীল। প্রকাশ্যে বেইজিং কূটনৈতিকভাবে ধৈর্য, আলোচনা এবং নিরাপদ নৌ চলাচলের আহ্বান জানালেও নেপথ্যে তাদের বার্তা ছিল অনেক বেশি জোরালো ও সরাসরি। জ্বালানি পরিবহন ও বাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে সংঘাত যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য ইরানকে হুতিদের ওপর নিজেদের প্রভাব কাজে লাগাতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। তবে বিষয়টি সম্পর্কে জানাশোনা থাকা সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, বার্তাটি কীভাবে বা কোন মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল, তা নির্দিষ্ট করে জানা যায়নি। এমনকি গত বুধবার ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বেইজিং সফরের সময় বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত জানা যায়নি।
চীনের এই কূটনৈতিক উদ্যোগের জবাবে তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা পুরোপুরি নির্ভর করছে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ ও আগ্রাসন বন্ধ হওয়ার ওপর। তবে তিন ইরানি সূত্র আরও জানিয়েছে, বেইজিং তাদের চাওয়া বাস্তবায়নে তেহরানের ওপর সরাসরি কোনো অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি বা নির্দিষ্ট কোনো হুমকি দেয়নি।
এই সংবাদের বিষয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের এই আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বিস্তৃত হয়ে ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে ছড়িয়ে পড়ুক, তা চীন কোনোভাবেই চায় না। কারণ আঞ্চলিক অস্থিরতা বাড়লে কোনো পক্ষেরই কল্যাণ বা স্বার্থ রক্ষা হবে না।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানায়, প্রতিটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষা করা জরুরি এবং সাধারণ মানুষের জীবিকার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো কোনো অবস্থাতেই লক্ষ্যবস্তু করা যাবে না। পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে এমন সব পদক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি আলোচনা ও দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধানের তাগিদ দিচ্ছে চীন।
উল্লেখ্য, এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সৌদি সরকারের মিডিয়া অফিস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চীন ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটির অপরিশোধিত তেলের প্রধান ক্রেতা হিসেবে রয়েছে। আন্তর্জাতিক কোপলার-এর পণ্য বিশ্লেষণাত্মক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সমুদ্রপথে ইরান থেকে রপ্তানি হওয়া মোট তেলের ৮০ শতাংশের বেশি একাই কিনেছে চীন, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।
আঞ্চলিক এক জ্যেষ্ঠ পশ্চিমা কূটনীতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে মন্তব্য করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে হুতিদের থামানোর ক্ষমতা রাখে—এমন হাতে গোনা কয়েকটি দেশের অন্যতম হলো বেইজিং। মূলত ১৯৯০-এর দশকে ইয়েমেনে সৌদি আরবের সুন্নি ধর্মীয় প্রভাবের বিরোধিতা করে হুতি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে। পশ্চিমা দেশ ও ইরানি সূত্রের মতে, গোষ্ঠীটি ইরানের অর্থ, অস্ত্র ও সরাসরি সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পরিচালিত এবং এটি তেহরানের পশ্চিমাবিরোধী ও ইসরায়েলবিরোধী ‘অক্ষশক্তি’র অন্যতম প্রধান অংশ।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর লোহিত সাগর ও বাব এল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের এই সামরিক তৎপরতা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটকে আরও ভয়াবহ করার পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধের ঝুঁকিও অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত ইতিমধ্যে অবরুদ্ধ থাকায় লোহিত সাগরের বন্দর ও তেলবাহী জাহাজে ধারাবাহিক হুতি হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রধান তেল রপ্তানি পথ একই সঙ্গে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের নতুন একটি ফ্রন্ট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের চলমান যুদ্ধ আরও বহুমুখী হয়ে উঠবে।
পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে এক ইরানি সূত্র জানায়, তেহরান ও তার মিত্ররা এখন মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথেই নিয়ন্ত্রণ ও চাপ তৈরি করেছে। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, চীন নিজেদের প্রয়োজনেই এই দুটি পথের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল।
ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ‘ইরান প্রোগ্রাম’-এর পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকা বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, তেহরানের ওপর ওয়াশিংটনের কোনো চাপের বিরোধিতা করতে পারে চীন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের স্বার্থ শুধু ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চীন তাদের ব্যবহৃত মোট জ্বালানি তেলের প্রায় অর্ধেক এই মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল থেকে আমদানি করে। এ ছাড়া গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি)ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বেইজিংয়ের বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ফলে ভাতানকার মতে, ইরান কৌশলগতভাবে হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করে নিজেদের শক্তি দেখাতে পারে, কিন্তু একপর্যায়ে এই চরম বৈরী অবস্থান সেই শক্তিকেই সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করতে শুরু করবে, যার ওপর তেহরান নিজে টিকে থাকার জন্য ক্রমেই নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।
বেইজিংয়ের এই গভীর উদ্বেগের পর তেহরান হুতিদের বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেবে কি না, তা নিয়ে ওই তিন ইরানি সূত্রের মধ্যেই সন্দেহ রয়েছে। তারপরও যুদ্ধ ও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত ইরানের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে তেল খাতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারে—এমন আর্থিক সক্ষমতা থাকা বিরল দেশগুলোর মধ্যে চীন অন্যতম। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র বৈরিতার মধ্যে বেইজিংয়ের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব তেহরানের কাছে অনেক বেশি। অন্যদিকে, ২০২৩ সালে দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে মধ্যস্থতা করে চীন বিশ্বজুড়ে নিজেদের কূটনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিল।
তবে তেহরানের ওপর বেইজিংয়ের রাজনৈতিক ক্ষমতারও নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। ২০২১ সালে দুই দেশের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা চুক্তি সই হলেও তেলবহির্ভূত বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম থাকায় ইরানের অভ্যন্তরে চীনকে নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। বিশেষ করে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোতে চীনের দ্রুত বাড়তে থাকা বড় বিনিয়োগের তুলনায় ইরানে তাদের ভূমিকা অনেকটাই সীমিত।
ইরানি সূত্রগুলোর মতে, চীনের অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক অবস্থানকে তেহরান পুরোপুরি উপেক্ষা করতে না পারলেও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের স্বার্থই শেষ কথা নয়। বরং অন্যান্য কৌশলগত ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অগ্রাধিকার বিবেচনা করেই ইরান সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ওই পশ্চিমা কূটনীতিকের মতে, আসল পরীক্ষা হবে বেইজিং তাদের এই দাবির পেছনে কতটা জোরালো অবস্থান নেয়। শেষ পর্যন্ত তেহরানের ওপর চীন সত্যিই তাদের প্রভাব ও চাপ ব্যবহার করতে প্রস্তুত কি না, তার ওপরই এই সংকটের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
এস এম/ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬







