মধ্যপ্রাচ্য

ড্রোন হামলার পর সৌদির ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন বন্ধ

সৌদির ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন

রিয়াদ,১৫ সেপ্টেম্বর- বিশ্বের তেলবাজারে নতুন করে চাপ তৈরি করেছে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা। গত বৃহস্পতিবার হামলার পর নিরাপত্তাজনিত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। গুরুত্বপূর্ণ এই পাইপলাইন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ঘাটতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের প্রধান তেলক্ষেত্রগুলোর সঙ্গে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরকে যুক্ত করেছে। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহন করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ শুরুর পর ফেব্রুয়ারি থেকে হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরবের জন্য পাইপলাইনটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে অবকাঠামোর ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনা ঘটার পর সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে।

ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতি বাহিনী লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব এলাকায় হামলা বাড়িয়েছে। ফলে সৌদি আরব পূর্বাঞ্চল থেকে লোহিত সাগরমুখী তেল পরিবহনে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

ক্ষয়ক্ষতি কতটা?

হামলায় পাইপলাইনের ক্ষয়ক্ষতির পুরো চিত্র এখনো জানা যায়নি। এটি মেরামত করে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে কত সময় লাগবে, তা নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। রয়টার্সকে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, মেরামতে পাঁচ থেকে ছয় সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে অন্য একটি সূত্রের দাবি, এর আগেই পাইপলাইনের কার্যক্রম আবার শুরু হতে পারে।

সৌদি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রিয়াদ ও মদিনার আশপাশের দুটি এলাকায় পাইপলাইনে ড্রোন হামলা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও হামলায় অবকাঠামোর ক্ষতি ও আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে।

সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনগুলো দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকের মাইসান প্রদেশ থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। ইরান সীমান্তের কাছের এই এলাকায় ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দীর্ঘদিনের উপস্থিতি রয়েছে।

এর আগে মার্চে ইয়ানবুর সৌদি আরামকো-এক্সনমোবিল শোধনাগারের কাছেও হামলা হয়েছিল। ওই হামলার কারণে লোহিত সাগরের বন্দর থেকে অপরিশোধিত তেল পরিবহন সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই তেল পরিবহন স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ায় ওই ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েনি। একই সঙ্গে হামলাটি সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের তেল অবকাঠামোও যে হামলার ঝুঁকির বাইরে নয়, তা স্পষ্ট করে।

কী এই ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন?

ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি ‘পেট্রোলাইন’ নামেও পরিচিত। ১৯৮১ সালে নির্মিত প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের আবকাইক এলাকার তেলক্ষেত্র থেকে আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল পৌঁছে দেয়।

পাইপলাইনটির সর্বোচ্চ পরিবহন সক্ষমতা দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এর মাধ্যমে তেল পরিবহন সেই সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম ছিল। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে, যা জানুয়ারির পর সর্বনিম্ন। হুতিদের হামলার কারণে লোহিত সাগরপথ ব্যবহার কঠিন হয়ে পড়ায় এই প্রবাহ কমেছে।

তবে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম পাঁচ মাসে সৌদি আরব পশ্চিমমুখী পাইপলাইনে অপরিশোধিত তেল পরিবহন বাড়িয়ে দৈনিক প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেলে উন্নীত করেছিল। এই পরিমাণ বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান। এর ফলে সমুদ্রপথে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার না করেও সৌদি আরব তেল রপ্তানি করতে পেরেছে।

বৈশ্বিক তেলবাজারে প্রভাব কতটা?

পাইপলাইন বন্ধ হওয়ার ঘটনা এমন সময়ে ঘটেছে, যখন বৈশ্বিক তেলবাজার আগে থেকেই সরবরাহ সংকটের চাপে রয়েছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বে দৈনিক ২ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ হতো, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি। রয়টার্সের বরাতে শিল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে ওই প্রণালি দিয়ে দৈনিক মাত্র ৬০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছে। অর্থাৎ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরব লোহিত সাগরমুখী তেল সরবরাহ বাড়িয়েছে। তবে সেই তেল পরিবহন ও রপ্তানি নির্ভর করছে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন, সংরক্ষণাগার এবং নিরাপদে চলাচল করতে সক্ষম ট্যাংকারের ওপর। ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এসব অবকাঠামো ও পরিবহনব্যবস্থাও হামলার ঝুঁকিতে পড়েছে।

রয়টার্সের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পাইপলাইন বন্ধ থাকলে ইয়ানবুতে থাকা মজুত দিয়ে প্রায় পাঁচ থেকে সাত দিন রপ্তানি চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। এ ছাড়া মিসরের আইন সোখনা ও সিদি কেরিরে সৌদি তেল সংরক্ষিত রয়েছে, যা আরও কয়েক দিনের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে।

তবে এই মজুত বৈশ্বিক বাজারকে দীর্ঘ সময় সুরক্ষা দিতে পারবে না। এরই মধ্যে বিশ্ববাজারে তেলের মজুত কমছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জানিয়েছে, হরমুজ ও লোহিত সাগরে সরবরাহ বিঘ্নের কারণে আগস্টে সৌদি আরবের তেল উৎপাদন তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস, চলতি বছরে বিশ্বে তেল সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫৭ লাখ ব্যারেল কমতে পারে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশ।

এখন পর্যন্ত মজুত তেল ও কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার কারণে দামের ওপর বড় ধরনের চাপ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ছিল। তবে আঞ্চলিক সংঘাত ও সরবরাহে বিঘ্ন যত দীর্ঘ হবে, মজুত তত কমবে এবং তেলের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

জুনে আইইএ সতর্ক করেছিল, মজুত থেকে তেল সরবরাহ অব্যাহত থাকলে তা সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। মজুত অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেছিলেন।

পাইপলাইনের ক্ষতি বড় আকারের হলে এবং ইয়ানবু ও এর পরবর্তী নৌপথে হামলার ঝুঁকি অব্যাহত থাকলে সৌদি আরবের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কমে যাওয়া তেল রপ্তানি পূরণ করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

গাভেকাল রিসার্চের মতে, ইয়ানবুতে হুতি ড্রোন হামলার হুমকির কারণে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। কারণ, বন্দরটির মাধ্যমে দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল প্রক্রিয়াজাত হয় এবং একই সময়ে বিশ্বজুড়ে শোধন সক্ষমতাও বড় ধরনের চাপে রয়েছে।

এস এম/ ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

Back to top button
🌐 Read in Your Language