মাঝরাতে তোলপাড় কালীঘাট: তালা কেটে অভিষেকের বাড়িতে পুলিশি অভিযান, ছুটে গেলেন মমতা!

কলকাতা, ১৩ জুন – গভীর রাতে কলকাতার কালীঘাটে সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য অভিষেক ব্যানার্জীর বাসভবনে এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় তল্লাশি অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। শনিবার (১৩ জুন) রাত ২টা থেকে ৩টার মধ্যে শুরু হওয়া এই আচমকা অভিযানে রাজ্য পুলিশের পাশাপাশি যোগ দেন কেন্দ্রীয় বাহিনীর (CAPF) সদস্যরাও। ভোর রাতের এই আকস্মিক অভিযানে গোটা এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
দলীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, একটি বড়সড় আর্থিক প্রতারণা ও জমি জালিয়াতির মামলার তদন্তের সূত্র ধরে এই যৌথ অভিযান চালানো হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি, অভিষেক ব্যানার্জীর ব্যক্তিগত সহকারী সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি থানায় একটি আর্থিক প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সুমিত রায়ের খোঁজে তল্লাশি চালাতে গিয়ে তাঁর মোবাইল ফোনের টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করে পুলিশ দেখতে পায়, সেটি অভিষেকের কালীঘাটের বাড়ির ভেতরেই রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শালবনি থানার পুলিশ, কলকাতা পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী যৌথভাবে বাড়িটি ঘেরাও করে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাড়ির মূল ফটক ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় তারা দীর্ঘ সময় বাইরে অপেক্ষা করে বারবার নিরাপত্তারক্ষীদের ডাকেন। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে প্রায় চার ঘণ্টা পর ভোর ৫টার দিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা (Disaster Management) দলের সহায়তায় গ্যাস কাটার ও হাতুড়ি এনে মূল ফটকের তালা কেটে ভেতরে ঢোকে পুলিশ। এরপর সকাল সাড়ে ৬টা থেকে দ্বিতীয় তলা থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত প্রায় ৯০ মিনিট ধরে পুরো বাড়িতে চিরুনি তল্লাশি চালানো হয়।
ছুটে গেলেন মমতা ব্যানার্জী
অভিষেক ব্যানার্জীর বাড়িতে পুলিশি অভিযানের খবর পেয়েই ভোররাতে সেখানে ছুটে যান পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল কংগ্রেস প্রধান মমতা ব্যানার্জী। তিনি অভিযান চলাকালীন বেশ কিছুক্ষণ বাড়ির ভেতরে অবস্থান করেন এবং পুরো পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখেন। তবে এই অভিযান নিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে সরাসরি কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানাননি তৃণমূল সুপ্রিমো।
“তন্নতন্ন করে খুঁজেও কিছুই মেলেনি”, ক্ষোভ অভিষেকের
সকালে তল্লাশি অভিযান শেষ করে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী বেরিয়ে যাওয়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তৃণমূল নেতা অভিষেক ব্যানার্জী। তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, তারা ভোররাতে এসে বাড়ির মূল ফটকের তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকেছিল। এরপর তারা গোটা বাড়ি তল্লাশি চালায়। সবকিছু অন রেকর্ড (ভিডিও) রাখা হয়েছে। তারা কী পেয়েছে বা কাকে খুঁজছে, সেটা যারা তল্লাশি করতে এসেছিল সেই সংস্থাকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করুন।”
এদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ৯০ মিনিটের দীর্ঘ তল্লাশি শেষে পুলিশের ‘সিজার লিস্ট’ বা জব্দ তালিকায় ফলাফলের জায়গায় “NIL” (শূন্য) লেখা হয়েছে। অর্থাৎ, বাড়ি থেকে কোনো আপত্তিকর জিনিস বা টাকা যেমন মেলেনি, তেমনি অভিযুক্ত সুমিত রায়কেও সেখানে পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র পারদ চড়েছে। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র এবং সাগরিকা ঘোষ এই অভিযানকে মোদী সরকারের ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ ও ‘১০০% ভেন্ডেটা’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তদন্তকারী সংস্থা আইন মেনেই নিজেদের কাজ করেছে এবং অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা করে কোনো লাভ হবে না।
সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচনের পর দলীয় টানাপোড়েনের মাঝেই অভিষেকের বাড়িতে এই মধ্যরাতের হানা বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করল।
এনএন/ ১৩ জুন ২০২৬







