আইন-আদালত

মিরপুরে বৃদ্ধা মায়ের ট্র্যাজেডি: উচ্চপদস্থ ৪ সন্তানের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন, সুপ্রিম কোর্টের নোটিশ

ঢাকা, ৩ জুন – রাজধানীর মিরপুরের একটি ফ্ল্যাট থেকে ৭৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা নূর জাহান বেগমের পচাগলা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা দেশের বিবেককে। সমাজে পারিবারিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের এই নজিরবিহীন ঘটনায় এবার আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মৃত নূর জাহান বেগমের চার সন্তানের কাছে তাঁদের আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব পালনের বিষয়ে কৈফিয়ত এবং বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়ে রেজিস্ট্রি ডাকযোগে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

আজ বুধবার (৩ জুন) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি জনস্বার্থে এই নোটিশ পাঠান। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পাওয়া গেলে বিষয়টি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে উচ্চ আদালতের (হাইকোর্ট) নজরে আনা হবে।

মেধাবী ও সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানরা বড় হওয়ার পর বৃদ্ধ মা-বাবার কতটা খোঁজ রাখেন, এই ঘটনা যেন তার এক নির্মম দলিল।

নোটিশপ্রাপ্ত নূর জাহান বেগমের সেই চার সন্তান হলেন:

১. ড. এ কে এম আনিসুর রহমান (বড় ছেলে) – যুগ্ম সচিব, খুলনা সমুদ্র বন্দর।
২. অধ্যাপক ড. এ কে এম আশিকুর রহমান (মেজো ছেলে) – শিক্ষক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।
৩. কে এম আতিকুর রহমান (ছোট ছেলে) – কানাডাপ্রবাসী।
৪. ফাতেমা নাসরিন সুলতানা (একমাত্র মেয়ে) – মিরপুরের একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।

৭ দিন ধরে ফ্ল্যাটে পড়ে ছিল লাশ! নোটিশে যা জানতে চাওয়া হয়েছে

বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের উদ্ধৃতি দিয়ে নোটিশে বলা হয়, মিরপুরের একটি ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন ধরে একা বসবাস করছিলেন নূর জাহান বেগম। একপর্যায়ে তিনি নিজ ঘরেই মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, মৃত্যুর প্রায় সাত দিন পর তাঁর পচাগলা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি সন্তানদের কাছে তিনটি মূল বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ চেয়েছেন:

ভরণ-পোষণ ও চিকিৎসা: জীবিত অবস্থায় মায়ের ভরণ-পোষণ, চিকিৎসা, পরিচর্যা এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে সন্তানরা আসলে কী ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছিলেন?

যোগাযোগের অভাব কেন: মৃত্যুর পূর্ববর্তী সময়ে মায়ের সঙ্গে সন্তানদের শেষ কবে যোগাযোগ হয়েছিল এবং নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হয়েছিল কি না?

৭ দিন ধরে অন্ধকার: এত দীর্ঘ সময় ধরে মায়ের শারীরিক অবস্থা, জীবনযাপন কিংবা মৃত্যুর মতো ঘটনা সম্পর্কে একই শহরে থেকেও তারা কীভাবে এবং কেন অবগত ছিলেন না?

“এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য কাউকে আগাম অপরাধী হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নয়। বরং একটি আলোচিত ঘটনার প্রেক্ষাপটে সত্য উদঘাটন, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী প্রবীণ নাগরিকদের অধিকার সুরক্ষার বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করাই এর মূল লক্ষ্য।”— আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি

সংবিধান ও ২০১৩ সালের আইনের লঙ্ঘন?

নোটিশে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫, ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, প্রতিটি নাগরিকের মানবিক মর্যাদা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের যেমন দায়িত্ব, তেমনই পরিবারের সদস্যদেরও একে অপরের প্রতি আইনি দায়বদ্ধতা রয়েছে।

বিশেষ করে দেশে বলবৎ থাকা ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’ অনুযায়ী, সন্তানদের ওপর মা-বাবার সেবা-যত্ন ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই সন্তানরা সেই আইন যথাযথভাবে পালন করেছেন কি না, তা এখন জনস্বার্থে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

নূর জাহান বেগমের মৃত্যু আজ কেবল একটি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়। এটি আমাদের সমাজের পারিবারিক বন্ধনের অবক্ষয়, মায়া-মমতার অভাব এবং প্রবীণদের প্রতি চরম দায়িত্বহীনতার এক করুণ প্রতীকী রূপ। ৭ দিনের মধ্যে এই ভিআইপি সন্তানরা আইনি নোটিশের কী জবাব দেন, সেদিকেই এখন চোখ রাখছে পুরো দেশের মানুষ।

এনএন/ ৩ জুন ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language