৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ২০২৬

ওয়াশিংটন , ২৯ মে -নিউ ইয়র্কের আকাশে টানা বৃষ্টি ছিল, বাতাসে ছিল বৈরী আবহাওয়ার চাপ, তবু বাংলা বইয়ের টানে মানুষের পা থেমে থাকেনি। কেউ এসেছেন পরিবার নিয়ে, কেউ এসেছেন বন্ধুদের সঙ্গে, আবার কেউ দূরের অঙ্গরাজ্য কিংবা কানাডা থেকেও ছুটে এসেছেন। কারণ এটি কেবল বই কেনাবেচার আয়োজন নয়। এটি প্রবাসী বাঙালির ভাষা, স্মৃতি, সংস্কৃতি ও শিকড়ের সঙ্গে নতুন করে হাত মেলানোর এক অনন্য উপলক্ষ।
উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অন্যতম বৃহৎ আন্তর্জাতিক আয়োজন ৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ২০২৬ অত্যন্ত উৎসবমুখর, প্রাণবন্ত ও বর্ণাঢ্য পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে। গত ২২ মে শুক্রবার থেকে ২৫ মে সোমবার পর্যন্ত নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারে চার দিনব্যাপী এই বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। এবারের মেলার মূল প্রতিপাদ্য ছিল, “যত বই তত প্রাণ”। বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষের উপস্থিতি, লেখক পাঠকের আড্ডা, নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং প্রকাশকদের ব্যস্ততা প্রমাণ করেছে, প্রবাসে বাংলা বই এখনও মানুষের হৃদয়ের গভীর জায়গায় বসে আছে।
মেলার প্রথম দিনটি ছিল আবেগ, ঐতিহ্য ও স্মরণের এক মনোরম মেলবন্ধন। বিকেল থেকেই নিউ ইয়র্ক, নিউজার্সি, কানেকটিকাট, ম্যাসাচুসেটস, ভার্জিনিয়া, পেনসিলভানিয়া, মেরিল্যান্ড, ফ্লোরিডাসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও কানাডা থেকে বইপ্রেমী, লেখক, পাঠক, প্রকাশক ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা মেলা প্রাঙ্গণে আসতে থাকেন। জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্টস সেন্টারের সামনের খোলা প্রাঙ্গণে ঢোলের বাদ্যে শুরু হয় প্রাক উদ্বোধনী আয়োজন। মালবিকা চ্যাটার্জির নির্দেশনায় সংগীত সাধনার শিক্ষার্থীদের সমবেত কণ্ঠে বাংলা গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মেলার প্রথম সুর বেজে ওঠে।
এই পর্বে জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের তিন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মহাশ্বেতা দেবী, শামসুদ্দীন আবুল কালাম এবং তপন রায়চৌধুরীকে। তাঁদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন, পাঠ, সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠান মেলা প্রাঙ্গণে এক আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে। রোকেয়া রফিক বেবী মহাশ্বেতা দেবীর রচনা থেকে পাঠ করেন। শহিদুল আলম সাচ্চু পাঠ করেন তপন রায়চৌধুরীর ‘বাঙালনামা’ থেকে। চন্দ্রা ব্যানার্জির পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় নৃত্যাঞ্জলির শিল্পীদের পরিবেশনাও দর্শকদের মুগ্ধ করে।

প্রাক উদ্বোধনী আয়োজন শেষে কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন ফিতা কেটে ৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন। মেলার ৩৫ বছরের পথচলাকে স্মরণীয় করে রাখতে মূল প্রবেশপথে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় বইমেলার ইতিহাস তুলে ধরা হয়। ১৯৯২ সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত প্রতি বছরের উদ্বোধকদের নাম, ছবি ও পরিচিতির এই প্রদর্শনী ছিল নিউ ইয়র্কে বাংলা বইমেলার দীর্ঘ অভিযাত্রার এক মূল্যবান স্মারক।
উদ্বোধনের পর মিলনায়তনে দেশ বিদেশের খ্যাতনামা লেখক, বুদ্ধিজীবী, গবেষক, প্রকাশক ও গুণীজনসহ ৩৫ জন সম্মানিত অতিথি মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলন করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান, সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ফরিদুর রেজা সাগর, ড. দীপেন ভট্টাচার্য, সিনিয়র সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদী, কবি সুবোধ সরকার, ইমদাদুল হক মিলন, ফারুক মঈনউদ্দীন, জনপ্রিয় লেখক সাদাত হোসাইন, প্রকাশক মনিরুল হক, বিরূপাক্ষ পাল, আশরাফ কায়সার, মহিতোষ তালুকদার তাপস, নজরুল মিন্টোসহ আরও অনেকে। এরপর সমবেত কণ্ঠে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি অধ্যাপক রেহমান সোবহান তাঁর বক্তব্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘ পথচলার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত ৩৫ বছরে বাংলাদেশিরা আমেরিকায় একটি দৃশ্যমান জাতিগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। আগামী ৩৫ বছরে তারা এ দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে তিনি ১৯৭১ সালের ইতিহাসচর্চা, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সত্য ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অধ্যাপক রেহমান সোবহানকে দেওয়া হয় ‘মুক্তধারা সুকৃতজ্ঞ সম্মাননা’ ও আজীবন সম্মাননা। একই পর্বে সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান বর্তমান বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। রেহমান সোবহান ও রওনক জাহানের এই বিশেষ সংলাপ সঞ্চালনা করেন বইমেলার আহ্বায়ক ড. নজরুল ইসলাম।

প্রথম দিনের আরেকটি আবেগঘন পর্ব ছিল মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বিশ্বজিত সাহাকে নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন। ১৯৯২ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নিউ ইয়র্কে এই বইমেলার বীজ বপন করেছিলেন তিনি।
দ্বিতীয় দিনের বিভিন্ন পর্বে ছিল স্বরচিত কবিতা পাঠ, গুণীজন শ্রদ্ধাঞ্জলি, একাত্তরের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সেমিনার, নতুন বই নিয়ে আলোচনা এবং সমকালীন লেখালেখি নিয়ে মতবিনিময়। ‘কলম ও কৌতূহল’ শীর্ষক সাহিত্য আলোচনায় পারমিতা হিমের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় সমকালীন সাহিত্য, পাঠাভ্যাস এবং লেখকের দায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। একই দিন “প্রবাস জীবন বাঙালিকে দিয়েছে বাণিজ্যিকতা, কেড়ে নিয়েছে আন্তরিকতা” শীর্ষক বিতর্ক দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। বিরূপাক্ষ পালের ক্ষুরধার যুক্তি ও রসবোধ এই পর্বকে প্রাণবন্ত করে তোলে। রাতের প্রধান আকর্ষণ ছিল রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অদিতি মহসিনের একক সংগীতানুষ্ঠান ‘সীমার মাঝে অসীম’।

তৃতীয় দিনটি ছিল নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ এবং সম্মাননা প্রদানের মধ্য দিয়ে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সকাল থেকেই শিশু কিশোরদের চিত্রাঙ্কন ও বাংলা লিখন প্রতিযোগিতায় ছিল ব্যাপক উৎসাহ। বাংলা ভাষা, একুশে ফেব্রুয়ারি, শহীদ মিনার এবং জাতীয় স্মৃতিসৌধকে কেন্দ্র করে নতুন প্রজন্মের এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে, প্রবাসে জন্ম নেওয়া বা বেড়ে ওঠা শিশুদের কাছেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হচ্ছে।
এই দিনেই অনুষ্ঠিত হয় মুক্তধারা জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৬ প্রদান। প্রখ্যাত ভাষাসৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা ও ঔপন্যাসিক ড. আবদুন নূর এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার লাভ করেন। পুরস্কার হিসেবে তাঁর হাতে নগদ তিন হাজার মার্কিন ডলার, সম্মাননা ক্রেস্ট ও বিশেষ স্মারক তুলে দেওয়া হয়। বাংলা প্রকাশনা শিল্পে অবদানের জন্য চিত্ত রঞ্জন সাহা শ্রেষ্ঠ প্রকাশনা পুরস্কার লাভ করে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাতিঘর।

চতুর্থ ও সমাপনী দিনটি ছিল মেলার সবচেয়ে উজ্জ্বল ও জনসমাগমমুখর দিন। টানা দুদিনের বৃষ্টির পর আকাশ পরিষ্কার হলে মেলা প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের ঢল নামে। প্রকাশকদের স্টলে বই বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। গবেষণামূলক বই, নতুন উপন্যাস, স্মৃতিকথা এবং শিশুতোষ বইয়ের প্রতি পাঠকদের আগ্রহ ছিল বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো।
সমাপনী দিনের সবচেয়ে আলোচিত পর্ব ছিল “সৃজনশীলতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” শীর্ষক আয়োজন। রাব্বানী ভূঁইয়ার সঞ্চালনায় শতাধিক টিনএজার ও তরুণ এতে অংশ নেয়। সাহিত্য, প্রযুক্তি, ভবিষ্যতের শিক্ষা এবং মানব সৃজনশীলতার ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়ে তারা মতবিনিময় করে। আলোচনায় উঠে আসে, প্রযুক্তি যত দ্রুত বদলাক, মানবিক বোধ, ভাষা ও সাংস্কৃতিক শিকড় ধরে রাখাই আগামী প্রজন্মের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মেলায় বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে ২৬টি শীর্ষ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। তাদের এই অংশগ্রহণ প্রমাণ করে, প্রবাসের মাটিতেও বাংলা বইয়ের পাঠক আছে, বাংলা ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা আছে, বইকে ঘিরে মানুষের আবেগ এখনও জীবন্ত। মেলার সাফল্যে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনন্যার প্রকাশক মনিরুল হক বলেন, নিউ ইয়র্ক বইমেলা শুধু একটি বইমেলা নয়, এটি প্রবাসী বাঙালির আত্মিক মিলনমেলা। এত দূরে এসেও পাঠকদের যে ভালোবাসা পাওয়া যায়, সেটিই প্রকাশকদের নতুন করে কাজ করার অনুপ্রেরণা দেয়।
মেলার শেষ পর্বে সমবেত কণ্ঠে বাংলাদেশ ও আমেরিকার জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে ৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। মেলা কমিটির আহ্বায়ক ড. নজরুল ইসলাম, সহযোগী আহ্বায়ক ওবায়েদুল্লাহ মামুন, রাব্বানী ভূঁইয়া এবং চেয়ারপারসন ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ সংশ্লিষ্ট সকলকে, বিশেষ করে স্বেচ্ছাসেবক, প্রকাশক, লেখক, শিল্পী, পাঠক এবং প্রবাসী সংবাদমাধ্যমকে ধন্যবাদ জানান।

সমাপনী মঞ্চ থেকে আগামী বছরের মেলার তারিখও ঘোষণা করা হয়। ২০২৭ সালের ৩৬তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে ২১ মে থেকে ২৪ মে পর্যন্ত।
সব মিলিয়ে ৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার আয়োজন শেষে বলা যায়, এ বইমেলা কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়। এটি প্রবাসে বাঙালির স্মৃতি, ভাষা, ভালোবাসা ও আত্মপরিচয়ের এক চলমান ইতিহাস। এখানে বই শুধু মলাটবন্দি শব্দ হয়ে থাকে না, বই হয়ে ওঠে মানুষের সঙ্গে মানুষের সেতুবন্ধন।
এস এম/ ২৯ মে ২০২৬






