সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত: ১৫ শীর্ষ কর্মকর্তাকে ফিরিয়ে নিলো আইন মন্ত্রণালয়

ঢাকা, ২০ মে – বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন প্রশাসনিক পরিবর্তনের ঘটনা ঘটল। প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক মাসের মাথায় বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো বহুল আলোচিত ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়’। একই সঙ্গে এই সচিবালয়ের সিনিয়র সচিবসহ বিচার বিভাগীয় (জুডিসিয়াল সার্ভিস) ১৫ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত নেওয়া হয়েছে।
আইন ও বিচার বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে সরাসরি পরামর্শক্রমেই সরকার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। তবে এই সিদ্ধান্তের সময়কাল এবং আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে দেশের আইন অঙ্গনে ইতিমধ্যে নানা বিশ্লেষণ ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
গত মঙ্গলবার (১৯ মে) রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে আইন ও বিচার বিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত পর্যালোচনায় দেখা যায়, জুডিসিয়াল সার্ভিসের ১৫ জন সদস্যকে পরবর্তী উপযুক্ত পদে পদায়নের উদ্দেশ্যে আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হয়েছে।
তবে এই আদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর “ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা” (Retrospective Effect)। প্রজ্ঞাপনটি ১৯ মে জারি করা হলেও এর কার্যকারিতা দেখানো হয়েছে বিগত ১০ এপ্রিল থেকে।
আলাদা একটি অফিস আদেশে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাখিল করা যোগদানপত্রও ১০ এপ্রিল থেকে ভূতাপেক্ষভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। এই তারিখটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর ঠিক একদিন আগে, অর্থাৎ ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছিল।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের যাত্রা এবং বিলুপ্তির সময়রেখা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে:
১১ ডিসেম্বর, ২০২৫: তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ভবন-৪ এ জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই সচিবালয় উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলও উপস্থিত ছিলেন।
৯ এপ্রিল, ২০২৬: জাতীয় সংসদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়।
১০ এপ্রিল, ২০২৬: কর্মকর্তাদের আইন মন্ত্রণালয়ে যোগদানের কার্যকর তারিখ (যা ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকর করা হয়েছে)।
১৯ মে, ২০২৬: রাষ্ট্রপতি ভবনের অনুমোদন সাপেক্ষে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি।
বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠনকে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। দীর্ঘকাল ধরে অভিযোগ ছিল যে, অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতি এবং সামগ্রিক প্রশাসন আইন মন্ত্রণালয়ের (নির্বাহী বিভাগ) অধীনে থাকায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় এই অধ্যাদেশ বাতিল এবং সচিবালয় বিলুপ্তির পেছনে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এনএন/ ২০ মে ২০২৬









