ট্রাইব্যুনালে বাজানো হলো শেখ রেহানা ও সালমান এফ রহমানের সেই ফোনালাপ

ঢাকা, ২০ মে – ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তখন পতনের দ্বারপ্রান্তে আওয়ামী লীগ সরকার। বোন শেখ হাসিনাকে নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে দেশ ছাড়ছেন শেখ রেহানা। ঠিক সেই চূড়ান্ত মুহূর্তে ঢাকার গুলশানের বাসভবনে বসা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রভাবশালী উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তখনই বেজে ওঠে ফোন। ওপাশ থেকে ভেসে আসে শেখ রেহানার আতঙ্কিত ও তাড়াহুড়ো মাখানো কণ্ঠ—“এক সেকেন্ডও দেরি কইরেন না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরে যান!”
৫ আগস্টের সেই চরম নাটকীয় ও রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তের ২ মিনিট ৯ সেকেন্ডের একটি এক্সক্লুসিভ অডিও রেকর্ড এবার প্রকাশ্য এজলাসে বাজিয়ে শোনানো হলো। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে চলমান মামলার শুনানিতে সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এসআই আতিকুর রহমানের জবানবন্দি দেওয়ার সময় এই ফোনালাপটি শোনানো হয়।
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের সেই গোপন কথোপকথন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে শুনতে দেখা যায় স্বয়ং সালমান এফ রহমানকে। পাশে বসা ছিলেন সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও।
আদালত কক্ষে শোনানো সেই অডিওতে দেখা যায়, শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই তথা শেখ রেহানার দেবর ‘ববি’ (রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক) এবং মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক মিলে শেখ হাসিনাকে দেশ ছাড়তে রাজি করানোর পরপরই সালমান এফ রহমানকে সতর্ক করতে ফোন দেওয়া হয়।
নিচে সেই কথোপকথন হুবহু তুলে ধরা হলো:
সালমান: হ্যালো।
কর্নেল রাজিব: সালামালাইকুম স্যার। স্যার কর্নেল রাজিব বলছি স্যার। রেহানা আপা একটু কথা বলতো ওভার টু ওভার স্যার।
সালমান: কে?
কর্নেল রাজিব: রেহানা আপা, রেহানা আপা। জ্বি স্যার।
রেহানা: স্লামালাইকুম ভাইয়া।
সালমান: হ্যাঁ, অলাইকুমল্লাম।
রেহানা: জি আপনি কই?
সালমান: আমি আমার বাসায়।
রেহানা: থাইকেন না।
সালমান: থাকবো না, হ্যাঁ ঠিক আছে।
রেহানা: আমরা অন্য জায়গায় আছি, আমরা মানে ববি, টিউলিপ ওকে (শেখ হাসিনা) কনভিন্স করছে তো… কল না করতে পারলেও আল্লাহ যদি বাঁচাই রাখে কথা হবে।
সালমান: আচ্ছা, তোমরা অন্য জায়গায় চলে গেছ? আপাও গেছে?
রেহানা: জি ভাই। তো আপনি…
সালমান: আমরা যদি বাইর হইতে পারি, আমরা বের হয়ে যাবো। আনিসুল হককেই বের করে ফেলি সাথে?
রেহানা: হ্যাঁ, হ্যাঁ, যেটা হয় আপনি ইমিডিয়েটলি ওই যে শায়ান আর জয় যেটা বলছে আপনি ওইটা করেন।
সালমান: ঠিকাছে, ঠিকাছে। ওকে।
রেহানা: এক সেকেন্ডও দেরি কইরেন না। কারণ সম্পার বাসায় গেছে ফটো তুলছে এবং চারদিকে মানে সাদা জোব্বা পরা দাড়িওয়ালা এই আরকি। ইউ শুড বি, মানে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আর আমি কনভিন্স করতেছি যে, মানে যা আছে ওটা করবো আরকি। এখানে একদম থাকা সেফ না।
সালমান: আচ্ছা ঠিকাছে তাহলে ও কী বলবে মার্শাল ‘ল’ (সামরিক শাসন) ডিক্লার করতেছে না সে?
রেহানা: ঐগুলো এখন বাদ দেন, ইউ শুড বি লিভ ইমিডিয়েটলি (ঐসব চিন্তা বাদ দিয়ে এখনই পালান)।
সালমান: ওকে।
রেহানা: জ্বি ভাইয়া ফি-আমানিল্লাহ দোয়া করবেন।
সালমান: ফি আমানিল্লাহ।
রেহানা: স্লালামালাইকুম।
সালমান: অলাইকুমস্লাম।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে দেশজুড়ে কারফিউ জারি, ইন্টারনেট শাটডাউন এবং নির্বিচারে গণহত্যায় উসকানি দেওয়াসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে এই দুই হেভিওয়েটের বিচার চলছে। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে রাষ্ট্রপক্ষের ৯ম সাক্ষী হিসেবে সিআইডির ফরেনসিক কর্মকর্তা এই অডিওর সত্যতা নিশ্চিত করেন।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার এবং আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্য আইনজীবীরা। এই চাঞ্চল্যকর অডিও এবং সাক্ষ্যগ্রহণের পর আদালত মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ আগামী ৮ জুন (২০২৬) ধার্য করেছেন।
এনএন/ ২০ মে ২০২৬









