ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনা শেখ হাসিনার, দলীয় নেতাদের নিয়ে করবেন আত্মসমর্পণ

ঢাকা, ১০ জুলাই – ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছাড়ার পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক কোনো সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের দিল্লি থেকে দীর্ঘ দুই বছরের নীরবতা ভেঙে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টার এক রুদ্ধশ্বাস টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি ঘোষণা করেছেন—আগামী ডিসেম্বরের দিকেই তিনি বাংলাদেশে ফিরছেন। শুধু তাই নয়, দেশে ফিরে তিনি এবং বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন।
মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথায় নিয়ে এই প্রথম শেখ হাসিনা দেশে ফেরার সম্ভাব্য সময় ও আত্মসমর্পণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে আনলেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক পারমাণবিক বিস্ফোরণের মতো তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
“গ্রেপ্তার বা হত্যা করলেও যাব, দেশের মাটিতেই মরতে চাই”
৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা রয়টার্সকে বলেন, দেশে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে এবং দল হিসেবে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, সেটি তিনি জানেন। তা সত্ত্বেও তিনি স্বেচ্ছায় ফিরতে চান। সাক্ষাৎকারে নিজের আবেগ ও ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “দেশে ফেরার পর তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে। তারপরও আমাকে যেতে হবে। আমার দলের নেতা-কর্মীদের ওপর ভয়াবহ দমন-পীড়ন চলছে। যদি মৃত্যুও হয়, আমি দেশের মাটিতেই মরতে চাই—যেখানে আমার মা-বাবা সমাহিত এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।”
তবে ডিসেম্বরের ঠিক কত তারিখে, কোন আদালতে বা কীভাবে তিনি আত্মসমর্পণ করবেন—নিরাপত্তাজনিত কারণে সেই সুনির্দিষ্ট তথ্য তিনি প্রকাশ করেননি।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালসহ জ্যেষ্ঠ নেতারাও করছেন সারেন্ডার!
শেখ হাসিনা জানান, ভারতে আশ্রয় নেওয়া এবং আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারাও তার এই পরিকল্পনার অংশ। তিনি বলেন, “আমাদের প্রায় সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাই আমি বলেছি, এবার আমি দেশে ফিরছি এবং একদিন তোমরাও সবাই আসবে। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।”
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শেখ হাসিনার সঙ্গে এই আত্মসমর্পণ পরিকল্পনায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও রয়েছেন, যাঁর বিরুদ্ধেও বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। তবে কারাবরণ নিয়ে তিনি মোটেও উদ্বিগ্ন নন বলে জানান শেখ হাসিনা।
“কারও দয়ায় নয়, আমি নিজেই দেশে যাব”
ঢাকা-দিল্লির বর্তমান কূটনৈতিক টানাপোড়েন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শেখ হাসিনা স্পষ্ট জানান, দেশে ফেরা বা ফেরার সময় নিয়ে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে কোনো গোপন আলোচনা করেননি। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে বারবার চিঠি দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ঢাকার কর্তৃপক্ষ আমাকে দেশে ফেরত নিতে চায়। আমাকে ফেরত পাঠানোর জন্য তারা বারবার ভারতকে চিঠি দিচ্ছে। তবে আমি নিজেই দেশে যাব।”
রয়টার্স এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সরাসরি মন্তব্য করেনি, তবে তারা জানিয়েছে—বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ তারা পর্যালোচনা করছে এবং ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করতে চায়।
“ভুল হতে পারে, কিন্তু আওয়ামী লীগ কেন নিষিদ্ধ হবে?”
২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যুর বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে ভারতে বসে তা অস্বীকার করে আসছেন শেখ হাসিনা। তবে দীর্ঘ শাসনকাল নিয়ে তিনি বলেন, “একটি সরকার দীর্ঘদিন কাজ করলে ভুল হতে পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। তবে একটি সরকারের ভালো-মন্দ বিচার করার অধিকার জনগণের। আমি সেই বিচার জনগণের ওপর ছেড়ে দিলাম।”
তিনি আরও যোগ করেন, “তারা আমাকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম কেন স্থগিত করা হবে? আমরা খারাপ করে থাকলে জনগণকে সেই সিদ্ধান্ত নিতে দিন।” ইতোমধ্যে দেশে দল পুনর্গঠনের জন্য অনলাইনে ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন বলেও দাবি করেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দুই বছরের আপেক্ষিক স্থিতিশীলতার পর শেখ হাসিনার এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীব্র এবং মাঠের পরিস্থিতিকে নাটকীয়ভাবে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
এনএন/ ১০ জুলাই ২০২৬









