উত্তর আমেরিকা

শান্তি আলোচনার মাঝেই ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করতে রাজি ওয়াশিংটন

ওয়াশিংটন, ১৮ মে – চলমান তীব্র উত্তেজনা ও যুদ্ধবিরতির মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক বড় ধরনের বরফ গলার ইঙ্গিত মিলল। শান্তি আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত কঠোর নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা ‘তাসনিম’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

চলমান এই নেপথ্য শান্তি আলোচনার সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাত দিয়ে তাসনিম জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের এবারের খসড়া প্রস্তাবটি আগেরগুলোর চেয়ে অনেকটাই আলাদা। আগের প্রস্তাবগুলোতে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা বলা হলেও, এবার আলোচনা চলাকালীনই মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িক শিথিলের বিষয়ে সবুজ সংকেত দিয়েছে ওয়াশিংটন।

দীর্ঘদিন ধরে চলা অচলাবস্থার পর মার্কিন অর্থ দপ্তরের ‘অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল’ (OFAC) এই নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের জন্য বিশেষ ছাড়পত্র বা ‘ওয়েভার’ জারি করতে যাচ্ছে বলে খবরে বলা হয়েছে।

তবে দুই পক্ষের মধ্যে শর্ত নিয়ে এখনো কিছুটা মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলছে:

ইরানের অবস্থান: তেহরান শুরু থেকেই স্পষ্ট করে এসেছে যে, যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই চুক্তির প্রধান শর্তই হতে হবে তাদের ওপর থেকে সব ধরনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা স্থায়ীভাবে প্রত্যাহার করা।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান: মার্কিন প্রশাসন এখনই স্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলতে নারাজ। তারা চূড়ান্ত সমঝোতা বা একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত এই তেল বিক্রির ছাড়পত্রকে একটি সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবেই ধরে রাখতে চায়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী যৌথভাবে ইরানে একযোগে ভয়াবহ বিমান হামলা (অপারেশন এপিক ফিউরি) শুরু করার পর মধ্যপ্রাচ্যে এই প্রলয়ঙ্করী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ প্রায় সাড়ে তিন হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।

এর জবাবে ইরানও দমে যায়নি। তারা পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইসরায়েল এবং জর্ডান, ইরাক, সৌদি আরব, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় এক ডজন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে গুঁড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের ধমনী হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’ কার্যত বন্ধ করে দেয় তেহরান, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে যায়।

যুদ্ধের ৪০ দিনের মাথায় গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই দেশ প্রথমে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। পরবর্তীতে সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির মেয়াদ অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়িয়ে দেন এবং মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ অভিযান ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িকভাবে স্থগিত করেন।

যদিও গতকালই ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ হুঁশিয়ারি দিয়ে লিখেছিলেন, “ইরানের জন্য সময় ফুরিয়ে আসছে, দ্রুত চুক্তি না করলে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।” কিন্তু সেই কড়া হুমকির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের এই নমনীয় অবস্থান এবং ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সম্মতি এক নতুন বার্তা দিচ্ছে।

ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের প্রস্তাব আদান-প্রদান এবং কূটনৈতিক তৎপরতা এখন তুঙ্গে। তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা সাময়িক শিথিল হওয়ার এই খবর আন্তর্জাতিক বাজারেও বড় স্বস্তি আনবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

এনএন/ ১৮ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language