৩ লাখ কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট অনুমোদন! থোক বরাদ্দ নিয়ে শুরু হলো নতুন বিতর্ক

ঢাকা, ১৮ মে – দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ! আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। দীর্ঘ সময় পর একটি নির্বাচিত সরকারের অধীনে এই বিশাল উন্নয়ন বাজেট পাস হলো।
আজ সোমবার (১৮ মে, ২০২৬) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এনইসি সম্মেলনকক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় এই মেগা বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়।
সভা শেষে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, “৩ লাখ কোটি টাকার এই উন্নয়ন বাজেট আমাদের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রাখবে। যেহেতু দীর্ঘদিন পর একটি নির্বাচিত সরকার এডিপি পাস করেছে, তাই এবার প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও হার অতীতের চেয়ে অনেক বাড়বে।”
একনজরে এডিপির অংক ও অর্থায়ন
- মোট এডিপি: ৩,০০,০০০ কোটি টাকা (স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার ৮,৯২৪ কোটি টাকাসহ মোট ব্যয় ৩,০৮,৯২৪ কোটি টাকা)।
- সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি): ১,৯০,০০০ কোটি টাকা।
- বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান: ১,১০,০০০ কোটি টাকা।
- অন্তর্ভুক্ত প্রকল্প: মোট ১,১২১টি (নতুন অননুমোদিত প্রকল্প আরও ১,২৭৭টি)।
এবারের বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে।
পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৫০,০৯২ কোটি টাকা ১৬.৭০%, শিক্ষা খাতে ৪৭,৫৯১ কোটি টাকা ১৫.৮৬%, স্বাস্থ্য খাতে ৩৫,৫৩৫ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩২,৬৯১ কোটি টাকা, স্থানীয় সরকার বিভাগ (শীর্ষ মন্ত্রণালয়)৩৩,৭৩৫ কোটি টাকা , সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে ৩০,৭৪১ কোটি টাকা।
ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডে বিশাল সামাজিক সুরক্ষাজনগণের ওপর থেকে মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এবারের এডিপিতে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
সামাজিক উন্নয়ন সহায়তার ১৭ হাজার কোটি টাকার মধ্যে:
- ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি: সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সর্বোচ্চ ১৪,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
- কৃষক কার্ড: কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কৃষকদের সহায়তায় দেওয়া হচ্ছে ১,৪০০ কোটি টাকা।
- উপাসনালয় ভাতা: ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেশের মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয়ের দায়িত্ব পালনকারীদের সম্মানীর জন্য বরাদ্দ থাকছে ১,১০০ কোটি টাকা।
বিতর্কের কেন্দ্রে ‘অস্বাভাবিক থোক বরাদ্দ’! স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
এবারের এডিপির সবচেয়ে বড় আলোচনার এবং সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এর বিশাল ‘থোক বরাদ্দ’। মোট উন্নয়ন বাজেটের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা রাখা হয়েছে থোক বরাদ্দ হিসেবে, যা কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের বাইরে অনির্দিষ্ট রয়েছে।
কার্যপত্র অনুযায়ী, স্বাস্থ্য বিভাগের চলমান প্রকল্পের বরাদ্দ যেখানে মাত্র ৬,০০৮ কোটি টাকা, সেখানে থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০,৮০০ কোটি টাকা (যা মূল বরাদ্দের সাড়ে তিন গুণ)! একইভাবে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৫,০৪৮ কোটি টাকার বিপরীতে ১৪,৩৯২ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষায় ৩,০৭৯ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নির্দিষ্ট প্রকল্পের বাইরে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ রাখায় আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে বড় সংশয়!
৩ লাখ কোটি টাকার এই বিশাল বাজেট ঘোষণা করা হলেও এটি আসলেই কতটা বাস্তবায়িত হবে—তা নিয়ে বড়সড় সংশয় রয়েছে। কারণ, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৩৬.১৯ শতাংশ। যেখানে আগের ছোট বাজেটই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, সেখানে নতুন করে আরও বড় বাজেট আমলারা কীভাবে বাস্তবায়ন করবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এনএন/ ১৮ মে ২০২৬









