জাতীয়

মুগদার সেই প্রবাসীর খুনের লোমহর্ষক বর্ণনা দিল র‍্যাব

ঢাকা, ১৮ মে – রাজধানীর মুগদার মান্ডা ও মানিকনগর এলাকা থেকে পলিথিনে মোড়ানো খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটন করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। এটি কোনো সাধারণ হত্যাকাণ্ড নয়; বরং পরকীয়া প্রেম, বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন এবং আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ফাঁসের হুমকির জের ধরেই খুন হতে হয়েছে সৌদিপ্রবাসী মোকাররম মিয়াকে (৩৮)।

আজ সোমবার (১৮ মে, ২০২৬) বিকেলে র‍্যাব-৩ সদর দপ্তরে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের এই চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক বর্ণনা তুলে ধরেন স্কোয়াড্রন লিডার মো. সাইদুর রহমান। এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে হেলেনা বেগম নামে এক নারী এবং তাঁর ১৩ বছর বয়সী মেয়েকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব। মূল পরিকল্পনাকারী তাসলিমা আক্তার এখনো পলাতক।

র‍্যাব জানায়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের বাসিন্দা মোকাররম মিয়া সৌদি আরবে থাকাকালীন নিজ এলাকার আরেক প্রবাসীর স্ত্রী তাসলিমা আক্তারের সঙ্গে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়েন। গত ১৩ মে দিবাগত রাতে সৌদি আরব থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেমে মোকাররম নিজের বাড়িতে যাননি। তিনি সরাসরি চলে যান মুগদার মান্ডায় তাসলিমার বান্ধবী হেলেনার ভাড়া বাসায়।

এক কক্ষের সেই বাসায় হেলেনা তাঁর ১৩ বছরের মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। মোকাররমের আসার খবর পেয়ে তাসলিমাও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এসে ওই বাসায় যোগ দেন।

সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব কর্মকর্তা সাইদুর রহমান জানান, ওই এক কক্ষের বাসাতেই তাসলিমা ও মোকাররমের মধ্যে বিয়ে নিয়ে তুমুল তর্কাতর্কি শুরু হয়। দীর্ঘদিনের পরকীয়া সম্পর্কের মাঝে তাদের মধ্যে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছিল এবং মোকাররমের কাছে তাসলিমার কিছু ‘আপত্তিকর’ ছবি ও ভিডিও ছিল।

তাসলিমা বিয়ে করতে রাজি না হওয়ায় মোকাররম তাঁর দেওয়া ৫ লাখ টাকা ফেরত চান এবং টাকা না দিলে সেই ছবি-ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন। এদিকে হেলেনার অভিযোগ, মোকাররম ওই রাতে তাঁর ১৩ বছরের মেয়েকেও ধর্ষণের চেষ্টা করেছিলেন। এই পরিস্থিতিতে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে তাসলিমা ও হেলেনা মিলে মোকাররমকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করেন।

১৪ মে সকালের খাবারের সঙ্গে মোকাররমকে প্রচুর পরিমাণে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দেন তাসলিমা ও হেলেনা। মোকাররম অচেতন হয়ে পড়লে প্রথমে বালিশ চাপা দিয়ে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পুরোপুরি অচেতন না হওয়ায় মোকাররমের সঙ্গে খুনিদের প্রচণ্ড ধস্তাধস্তি হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সবাই মিলে ঘরের ভেতরে থাকা হাতুড়ি এবং বটি দিয়ে মোকাররমের মাথায় ও শরীরে উপর্যুপরি আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

এরপর লাশটি বাথরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঠাণ্ডা মাথায় বটি দিয়ে মোকাররমের দেহ কেটে আটটি খণ্ড করা হয়।

নৃশংসতার এখানেই শেষ নয়। লাশের টুকরোগুলো পলিথিন ও বস্তায় ভরে গভীর রাতে বাসার কাছের একটি ময়লার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয়। আর চেনার উপায় না রাখতে মাথাটি কেটে ফেলা হয় মানিকনগরের অনেক দূরে।

ঘটনার পরদিন খুনিরা অত্যন্ত স্বাভাবিক আচরণ করেন। আশেপাশের মানুষের মনে যেন কোনো সন্দেহ না জাগে, সেজন্য তারা নিজেদের বাসার ছাদে আড্ডা ও বিশেষ খাবারের আয়োজনও করেছিলেন!

কিন্তু দুই দিন পর লাশের টুকরো পচে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়ালে স্থানীয় বাসিন্দারা ‘৯৯৯’ নম্বরে ফোন করে পুলিশকে জানান। পুলিশ এসে খণ্ডিত দেহ উদ্ধার করে এবং আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) নিয়ে নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করে। এরপর রোববার রাতেই অভিযান চালিয়ে হেলেনা ও তাঁর নাবালিকা মেয়েকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং উদ্ধার করা হয় মোকাররমের বিচ্ছিন্ন মাথা।

র‍্যাব জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা এবং মোকাররমের পরকীয়া প্রেমিকা তাসলিমা আক্তারকে গ্রেপ্তারের জন্য ডিবি ও র‍্যাবের একাধিক টিম চিরুনি অভিযান চালাচ্ছে। যেকোনো মুহূর্তে তিনি গ্রেপ্তার হতে পারেন।

এনএন/ ১৮ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language