
ইউরোপের হৃদয়ে, আল্পস পর্বতমালার কোলে স্লোভেনিয়ার রাজধানী লিউব্লিয়ানা (Ljubljana) এক অনন্য মাধুর্যের শহর। ভৌগলিকভাবে এটি মধ্য ইউরোপের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত, যেখানে উত্তরে অস্ট্রিয়া, পশ্চিমে ইতালি, দক্ষিণে ক্রোয়েশিয়া এবং পূর্বে হাঙ্গেরি। চার দিকের এই বৈচিত্র্যময় সীমান্ত লিউব্লিয়ানাকে করে তুলেছে বহুসংস্কৃতির এক মিলনভূমি।
ইতালির বন্দরনগরী ত্রিয়েস্তে থেকে সোমবার সকালে ইউরোপের জনপ্রিয় বাস সার্ভিস ফ্লিক্সবাস (FlixBus) -এ চলে এলাম লিউব্লিয়ানা। শহরটি ইউরোপের মধ্যে পরিচ্ছন্ন, শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ নগরী হিসেবে স্বীকৃত। লিউব্লিয়ানায় হাঁটতে হাঁটতে মনে হয় প্রতিটি মোড়ে লুকিয়ে আছে শিল্প, ইতিহাস আর প্রকৃতির গল্প। স্লোভেনিয়ার মানুষ মূলত স্লোভেনীয় ভাষায় কথা বলে। এটি এ দেশের সরকারি ভাষা এবং অধিকাংশ নাগরিকের মাতৃভাষা। তবে, তরুণ প্রজন্ম ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট লোকজন খুব ভালো ইংরেজি বলতে পারে।

লিউব্লিয়ানা জীবনযাত্রার মানের দিক থেকে ইউরোপের শীর্ষ শহরগুলোর একটি। এখানকার মানুষ শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনা এবং প্রকৃতিপ্রেমী।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, লিউব্লিয়ানার শিকড় রোমান যুগে প্রসারিত। খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকে এখানে এমোনো (Emona) নামে এক রোমান বসতি গড়ে উঠেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি যুগোস্লাভিয়ার অংশ হলেও ১৯৯১ সালে স্বাধীন স্লোভেনিয়ার রাজধানী হিসেবে নতুন পরিচয় পায়।

লিউব্লিয়ানা বিখ্যাত তার সবুজ পরিবেশ আর নান্দনিক নগর-পরিকল্পনার জন্য। শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে শান্ত লিউব্লিয়ানিকা নদী (Ljubljanica River), যার দুই তীরে সাজানো রঙিন ক্যাফে, শিল্পকর্ম ও সেতু। ট্রিপল ব্রিজ (Tromostovje), ড্রাগন ব্রিজ (Zmajski Most) কিংবা শু ব্রিজ। এসব স্থাপত্য নিদর্শন শহরকে করে তুলেছে খোলা আকাশের এক জাদুঘর। পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা লিউব্লিয়ানা ক্যাসেল থেকে পুরো নগরীর নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে লিউব্লিয়ানা সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত। এখানে রয়েছে স্লোভেনিয়ান ন্যাশনাল অপেরা, থিয়েটার, আর্ট গ্যালারি ও জাদুঘর। শহরটি বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম মিলনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত; প্রতি বছর আন্তর্জাতিক বইমেলা ও নানা উৎসবের আয়োজন করা হয়। বিখ্যাত কবি ফ্রাঁসোয়া প্রেশেরেন (France Prešeren) এর সাহিত্যকীর্তি এখানকার সংস্কৃতিকে করেছে অনন্য।

যোগাযোগ ব্যবস্থার দিক থেকেও লিউব্লিয়ানা অত্যন্ত আধুনিক। শহরের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইউরোপের বড় শহরগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। রেল, বাস ও সড়কপথে এর সংযোগ রয়েছে অস্ট্রিয়া, ইতালি, ক্রোয়েশিয়া ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে। শহরের ভেতরে পরিবেশবান্ধব বাস ও সাইকেল সেবা লিউব্লিয়ানাকে করেছে আধুনিক ও স্থায়িত্বশীল নগরী।

লিউব্লিয়ানা শুধু রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রই নয়, এটি উচ্চশিক্ষার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য। এখানে অবস্থিত লিউব্লিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Ljubljana), যা ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং স্লোভেনিয়ার সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রায় চল্লিশ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করে, যাদের মধ্যে বাংলাদেশিসহ হাজার হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী রয়েছে।

শুধু লিউব্লিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, শহরে আরও রয়েছে University of Nova Gorica এবং কিছু বেসরকারি ইনস্টিটিউট যেগুলো উচ্চশিক্ষার সুযোগ প্রসারিত করেছে।

এখানে বেশিরভাগ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বৃত্তি ও এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামের মাধ্যমে ইঞ্জিনিয়ারিং, তথ্যপ্রযুক্তি ও চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে পড়ছে।

লিউব্লিয়ানা ভ্রমণ মানেই ইতিহাস, স্থাপত্য, প্রকৃতি আর সংস্কৃতির এক রঙিন মিশ্রণ। শহরটি বড় নয়, কিন্তু প্রতিটি কোণায় আছে দেখার মতো অনেক কিছু।

পরবর্তী গন্তব্য: জাগরেব (Zagreb, Croatia)










