সম্পাদকের পাতা

আমেরিকায় ভুয়া সার্টিফিকেটের রমরমা বাণিজ্য

নজরুল মিন্টো

অনলাইনে রীতিমতো বিজ্ঞাপন দিয়ে চলে সার্টিফিকেট বিক্রির জমজমাট ব্যবসা। লক্ষ্য মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরে কর্মরত মধ্যম মানের শিক্ষিত প্রবাসী বাংলাদেশি— যারা বিশ্বাস করেন, একটি বিদেশি সার্টিফিকেট মানেই সামাজিক প্রতিষ্ঠা। শুধু তারাই নয়, ইউরোপ, আমেরিকা বা কানাডায় বসবাসকারী অনেক অভিবাসী বাংলাদেশির কাছেও এসব ভুয়া ডিগ্রির রয়েছে এক অদ্ভুত সামাজিক মূল্য। কে কোথা থেকে কীভাবে এইসব ডিগ্রি পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন খুব একটা ওঠে না; কিন্তু হঠাৎ কোনো কমিউনিটি নেতার নামের আগে-পিছে যুক্ত হওয়া ডিগ্রির তকমা দেখে অনেকেই অবাক হতে পারেন।

এই ভুয়া ডিগ্রি কেনার উদ্দেশ্যও বিচিত্র। অনেকে কেবল নিজেদের একটু বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরতে চান। কেউ কেউ এই বিদেশি সনদ ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখেন অফিসের দেয়ালে, কেউ মিডিয়ার আলোচনায় অংশ নেন ‘বিশেষজ্ঞ’ পরিচয়ে, আবার কেউ ব্যবসায়ী ফোরাম বা ক্লাবের সদস্যপদ জোটাতে এই সার্টিফিকেট ব্যবহার করেন। এমনকি বাংলাদেশের কিছু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের জাল পিএইচডি সনদের ভিত্তিতে অনেকে অধ্যাপক বা উপদেষ্টার পদেও আসীন হয়েছেন।

অনেকে জানেন—এই সার্টিফিকেটগুলো ভুয়া। তবু কেউ কিছু বলেন না। কারণ যারা এসব সার্টিফিকেট কিনছেন, তারা হয়তো পাশের বাড়ির প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, পরিচিত কোনো সফল ব্যবসায়ী, অথবা নিজেরই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। কারও নামের আগে-পিছে হঠাৎ করে ‘ড.’ বা ‘ব্যারিস্টার’ বা ‘এমবিএ’ দেখে মনে প্রশ্ন জাগলেও মুখ ফুটে কিছু বলা যায় না তবে আগ্রহ জাগায়।

আর এই আগ্রহই সাহস জোগায় খোঁজ নেয়ার। প্রথমে ইউটিউবে ভিডিও দেখা—“How to Get a Degree Without Class or Exam”—তারপর পরিচিত কারও পরামর্শ, আর এক পর্যায়ে হোয়াটসঅ্যাপে ভেসে আসে সেই চিরচেনা ম্যাসেজ—“আপনার কি ডিগ্রির দরকার? No Exam, No Class—শুধু আপনার অভিজ্ঞতা থাকলেই পেয়ে যাবেন MBA!”

একবার এই প্রস্তাব চোখে পড়লে পেছনে তাকানোর সময় আর থাকে না। তখন কেউ আর খোঁজ নেন না বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম কী, সেটি কোনো সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে কি না, কিংবা ওয়েবসাইটটি আসল না নকল। কারণ প্রলোভনটা বড় সহজ, বড় তীব্র—একটি বিদেশি ডিগ্রি, যেটি কেবল একখানা সার্টিফিকেট নয়, বরং এক অলিখিত সিঁড়ি, যা বেয়ে মানুষ চড়ে যেতে চায় সামাজিক উচ্চতার শিখরে।

এই আকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটতেই মানুষ ঢুকে পড়ে এক নিখুঁতভাবে নির্মিত প্রতারণার জালে—যেখানে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ মানে একটি চকচকে ওয়েবসাইট, আর ‘শিক্ষা’ মানে কেবল কাগজে ছাপা কিছু ঝলমলে অক্ষর। এখানে ক্লাসরুম নেই, নেই শিক্ষক, নেই প্রশ্নপত্র—তবু আছে এক ঝলমলে স্বপ্নের প্রতীক।

এই এক নতুন জগৎ—“লাইফ এক্সপেরিয়েন্স ডিগ্রি” নামে এক প্রতারণার শিল্পকলা, যেখানে কেউ বলে—“আপনার অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট; জ্ঞান, পরিশ্রম, সময় নয়।” এখানে নেই লাইব্রেরিতে রাত জাগার ক্লান্তি, নেই কোনো ক্লাসরুমের আত্মসংযম বা পরীক্ষার চাপ। তবু অবলীলায় মেলে এক ঝকঝকে ডিগ্রি, যেন কোনো যাদুকর তার ছোঁয়ায় নামের পাশে এমবিএ বা পিএইচডি বসিয়ে দিল।

এটি এক অদৃশ্য অহংকার—এক সামাজিক মুখোশ, যা গায়ে দিলে মানুষ নিজেকে আর দশজনের চেয়ে খানিকটা উঁচু মনে করে। এই মোহ কখনো আত্মপ্রবঞ্চনা, কখনো উচ্চাশা—কিন্তু অনেকের কাছে তা জীবনের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা।

এই আকাঙ্ক্ষার পিঠে চেপে যুক্তরাষ্ট্রে গজিয়ে উঠেছে এক কাগুজে সাম্রাজ্য—ডিপ্লোমা কারখানা। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় মানে শুধু একটি ওয়েবসাইট; এবং শিক্ষা? তা শুধু কাগজে ছাপা কিছু শব্দ, সিল-মারা কিছু প্রতারণার চিহ্ন।

সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার—এই জালিয়াতি এতটাই নিখুঁত, এতটাই বিশ্বাসযোগ্য যে, সত্য-মিথ্যার সীমারেখা কোথায় মিলিয়ে যায় তা বোঝার আগেই জীবনটা ঠকে যায়।

এই কারখানার “মূল দপ্তর” ছিল ঢাকার মোহাম্মদপুরে। একটি ভাঙাচোরা বাড়ির ভিতরে, রাতভর জ্বলত কম্পিউটারের নীল আলো। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় ছিল না, ভেতরে চলছে এক আন্তর্জাতিক ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ পরিচালনা। নাম: Advanced Technology Institute (ATI)। ওয়াশিংটন ডিসির ঠিকানা, মেইলে পাঠানো হয় .edu ডোমেইনের লিংক, আর ফেসবুক ইনবক্সে জ্বলজ্বল করে “Your PhD Degree is Ready!”

এই নকল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেছনে ছিলেন আবু সুফিয়ান, এক সময়ের আইবিএসের ড্রপআউট। ATI ছাড়াও গড়ে উঠেছিল Bremen University of Massachusetts, Columbus University, এমনকি ‘London American Global University’—সবই ডিজিটাল মায়াজাল।

সুফিয়ানের সঙ্গে ছিলেন শফিকুল ইসলাম (টেক হেড), যিনি .edu.pro ডোমেইনে ৩২টি ওয়েবসাইট বানিয়েছিলেন, এবং ফারিয়া আক্তার (অর্থ পাচারের রানি)—যিনি ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার প্রতারণা-কৌশলে ছিলেন অভিজ্ঞ।

তারা বিভিন্ন ডিগ্রি বিক্রি করতো বিভিন্ন দামে: Diploma Certificate: $300–$500, Bachelor (BSc/BBA): $800–$1,200, Masters (MBA/MSc): $1,500–$2,500, PhD: $3,000–$5,000, Medical (MBBS/Dental): $5,000–$10,000 ডলারে।

পেমেন্ট হতো: বাংলাদেশে: ৮০% বিকাশ, ১৫% নগদ, ৫% ব্যাংক ট্রান্সফার; আন্তর্জাতিক: ওয়েস্টার্ন ইউনিয়ন, ক্রিপ্টো, পেপ্যাল (ফেক অ্যাকাউন্ট)

পরিচয়ের ওজন বাড়াতে অনেকেই এ সার্টিফিকেট নিতেন বিজনেস কার্ডে ‘ড.’ বা ‘এমবিএ’ লেখার জন্য। আর এই চাহিদাকে পুঁজি করেই গড়ে উঠেছিল এই ATI চক্র।

২০১৯ থেকে ২০২২—মাত্র তিন বছরে, তারা আয় করে প্রায় ২.৩ মিলিয়ন ডলার। তাদের ডাটাবেসে ছিল ১২০০+ গ্রাহকের রেকর্ড। সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল MBA (৪০%), তারপর BSc Engineering (৩০%), ও মেডিকেল ডিগ্রি (১৫%)।

২০২২ সালে, US Homeland Security Investigations (HSI) অনুসন্ধান শুরু করে। WHOIS ডেটা থেকে শফিকুল ইসলামের নাম বের হয়, আর ফেসবুক পেজ ও ওয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল ট্র্যাক করে ধরা পড়েন আবু সুফিয়ান।

HSI-এর এক কর্মকর্তা বলেন, “It wasn’t just diploma fraud, it was cybercrime at an industrial level. They had departments—just like a real university.” (“এটা শুধু ডিপ্লোমা প্রতারণা ছিল না, এটা ছিল শিল্প-পর্যায়ের সাইবার অপরাধ। তাদের ছিল বিভিন্ন বিভাগ—একটা বাস্তব বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই।”)

২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করে চক্রের মূল সদস্যদের। জব্দ হয় ১২টি হার্ডডিস্ক, ৪২০০টি ফেক সার্টিফিকেট, ৮৭টি এক্সেল ট্রানজেকশন শিট।

যুক্তরাষ্ট্রে গ্র্যান্ড জুরি RICO, Wire Fraud, এবং Identity Theft ধারায় মামলা করে। যুক্তরাষ্ট্রে 18 U.S. Code অনুচ্ছেদ 1028 অনুযায়ী জাল পরিচয়পত্র তৈরি ও বিতরণ অপরাধ; এর আওতায় ভুয়া সার্টিফিকেট বিক্রেতাদের শাস্তি ১৫ বছরের কারাদণ্ড।

এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগ ও WES বাংলাদেশি ডিগ্রির ওপর সতর্কতা জারি করে। ইউরোপের ENIC-NARIC নেটওয়ার্ক বাংলাদেশি সার্টিফিকেট যাচাই কঠোর করে। WES ও World Bank-এর একটি রিপোর্টে বলা হয়, বাংলাদেশি অভিবাসীদের সার্টিফিকেট ভেরিফিকেশনের সংখ্যা ২০২৩ সালে ৩২% হ্রাস পেয়েছিল, যার পেছনে ডিপ্লোমা কারখানা কেলেঙ্কারির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

এই কাহিনি শুধু প্রতারণার বিবরণ নয়—এ এক জাগ্রত সামাজিক দলিল, যেখানে প্রযুক্তির সুবিধা, লোভের বিস্তার আর পরিচয় সংকট মিলে একটি জাতিকে ঠেলে দেয় আত্মপ্রবঞ্চনার অন্ধকার গহ্বরে। এখানে জ্ঞানের স্থানে দাঁড়ায় মোহ, পরিশ্রমের বদলে আসে কৃত্রিমতা, আর প্রকৃত মর্যাদার স্থানে স্থান পায় নকল কাগজে ছাপা ‘সাফল্য’।

এই প্রতারণা শেখায়—শিক্ষা শুধু কাগজে ছাপা কিছু শব্দ নয়, এটি আত্মিক অন্বেষণ, মানসিক প্রস্তুতি ও বৌদ্ধিক বিকাশের দীর্ঘ এক যাত্রা। shortcut পথে হয়তো গন্তব্যে পৌঁছানো যায়, কিন্তু সেখানে দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা তুলে থাকা যায় না।


Back to top button
🌐 Read in Your Language