
নিউইয়র্ক। শহরটি যেন এক বৈপরীত্যের প্রতিমা। এখানে রাত মানেই বিশ্রাম নয়, বরং তা এক অদ্ভুত সজাগতার নাম। কুইন্সের ৮৫তম স্ট্রিটে ডিসেম্বরের ঠান্ডা বাতাসে উড়ছে তুষারের গুঁড়ি। রাস্তার পাশের ছয়তলা বাড়িগুলোয় জ্বলজ্বলে আলো, ক্রিসমাসের সাজে মোড়া জানালাগুলো।
নিউইয়র্ক শহরের একটি বহুজাতিক জেলা কুইন্স, যেখানে বসবাস করে শত জাতির মানুষ। এখানেরই একটি অ্যাপার্টমেন্টের পাঁচতলায় বসবাস করতেন গোলাম মাওলা ও সেলিনা আক্তার। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে আসা এই দম্পতি প্রবাসে গড়ে তুলেছিলেন এক ছোট্ট অথচ নিখুঁত সংসার। দু’সন্তান তাদের। দশ বছরের কন্যা তাসনিয়া ও ছয় বছরের পুত্র তানজিত।
সেলিনা একজন শিক্ষকের মেয়ে। গোলাম মাওলা এক কাপড় ব্যবসায়ীর পুত্র। বিয়ের আগে তাদের মধ্যে জানাশোনা ছিল না। পরিবারের সদস্য এবং বন্ধুদের দেখাশোনার মাধ্যমে ১৯৯৪ সালের অক্টোবরে তাদের বিয়ে হয়। এর ৪ বছর পর গোলাম মাওলা আমেরিকা আসেন। ২০০৩ সালে সেলিনা আকতারও আমেরিকা চলে আসেন স্বামীর কাছে। নিউ ইয়র্কে গোলাম মাওলা ম্যানহাটনের ৪৬ নম্বর স্ট্রিটে কফি বিক্রি করতেন। স্ত্রীকে তিনি চাকরি করতে দেননি। প্রতিবেশি পারভীন বলেছেন, তিনি স্ত্রীকে ভীষণ ভালবাসতেন। সেজন্য তাকে চাকরি করতে দেননি।
তাদের জীবনে চাকচিক্য না থাকলেও ছিল অপার শান্তি। সন্ধ্যায় একসঙ্গে টিভি দেখা, ছুটির দিনে পার্কে যাওয়া, বিশেষ দিনে ঘরোয়া খাবারের আয়োজন; এই ছিল তাদের সুখ। প্রবাসের প্রতিটি দিন তারা গড়েছিলেন ধৈর্য, ভালোবাসা আর মায়ার ইট দিয়ে।
২০০৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর। সব ছিল স্বাভাবিক। সেলিনা তার সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলেন পাশের ঘরে। গোলাম মাওলা ফোনে কথা বলছিলেন বাংলাদেশে থাকা তার বোনের সঙ্গে। হঠাৎই নিচের রাস্তায় শুরু হয় গোলাগুলি। জানালার দিকে এগিয়ে যান সেলিনা। হয়তো কৌতূহলে, হয়তো উদ্বেগে। আর ঠিক তখনই, জানালার কাচ ভেদ করে প্রবেশ করে একটি বুলেট; তার চোখ ভেদ করে ঢুকে পড়ে মাথায়।
মেঝে রঞ্জিত হয় রক্তে। মৃত্যু ঘটে মুহূর্তেই। তার মুখের ওপর ছায়া ফেলে দেয় চিরস্থায়ী নিস্তব্ধতা। স্বামী যখন ঘরে ঢোকেন, তখনো জানতেন না তার জীবন এভাবে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ঘর ছিল অন্ধকার, তিনি ভেবেছিলেন স্ত্রী ঘুমিয়ে আছেন। কিন্তু মেঝেতে হাত দিতেই অনুভব করেন—ভেজা।
তখনই চিৎকার করে ওঠেন: “ওঠো সেলিনা! কি হয়েছে তোমার? এভাবে তুমি যেতে পারো না!”
কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন গোলাম মাওলা। সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে যান ওপরতলায়; প্রতিবেশী উইলমা নারসিসোর দরজায় ধাক্কা দেন। তাঁর মুখে তখন শব্দ নেই, শুধু নিঃশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসছে কান্না। উইলমা বলেন, “তিনি বলতে পারছিলেন না কিছুই। শুধু বললেন, ‘আমার স্ত্রীর চোখ দিয়ে রক্ত ঝরছে।’ তাঁর জামা রক্তে ভিজে গিয়েছিল। আমার হাতেও লেগে যায় সেই রক্ত।”
ঘরে তখন ঘুমন্ত তাসনিয়া আর তানজিত। তাদের অজান্তেই জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্ত পেরিয়ে গেছে। তাসনিয়া পরে শুধুই বলে, “আমার মা কি মারা গেছেন?”
ঘটনার পরপরই পুলিশ এসে আটক করে ২৩ বছর বয়সী মাতাল সেনা সদস্য ড্যানি কারপিওকে। টেক্সাসের ফোর্ট হুড ঘাঁটি থেকে ছুটিতে এসেছিল সে। বড়দিনের ছুটি ছিল, বাড়ি ফিরে বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের কথা ছিল তার। কিন্তু সে তার পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে বিয়ার, ভদকা পান করে রাস্তায় উন্মত্ত হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে গুলি চালাতে শুরু করে।
কুইন্স ডিস্ট্রিক্ট এটর্নি রিচার্ড এ. ব্রাউন নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, “ড্যানি তার অপরাধ স্বীকার করেছে। সে জানায়, আনন্দ করতেই গুলি ছুঁড়েছিল। তবে সে এখন অনুতপ্ত।” পুলিশ কমিশনার রেমন্ড কেলি বলেন, “সে হয়তো আনন্দ করছিল, কিন্তু আনন্দের নামেই একটা জীবন শেষ হয়ে গেল।”
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক সত্য হচ্ছে সেদিনই ছিল সেলিনা আক্তারের ২৯তম জন্মদিন। স্বামী-সন্তান মিলে জন্মদিনের ছোট্ট আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। পার্টির জন্য ফুল, কেকও আনা হয়েছিল। আর তার কয়েক ঘণ্টা আগেই সেলিনা রান্না করেছিলেন ভাত আর সবজি। টিভি দেখছিলেন, ফোনে কথা বলছিলেন বোনের সঙ্গে। কে জানত, ওই রাতেই নিভে যাবে তার চোখের আলো।
ঘটনাটি পুরো নিউইয়র্কের অভিবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিকে স্তম্ভিত করে দেয়। সবার মুখে একটাই প্রশ্ন—“আনন্দ করতে গিয়ে কিভাবে একজন মানুষের গুলি ছুঁড়ে আরেকজনের প্রাণ নিতে পারে?” স্থানীয় মসজিদে সেলিনার জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি তাকে শেষ বিদায় জানান।
সেলিনা ও গোলাম মাওলার জীবনের গল্পটি প্রবাস জীবনের দ্বৈত বাস্তবতাকে তুলে ধরে। উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে তারা দেশ ছেড়েছিলেন। কিন্তু যে দেশে তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এসেছিলেন, সেখানেই এক মাতাল সেনার বেপরোয়া গুলিতে সেলিনার মৃত্যু হলো। একটি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন গৃহবধূ কিভাবে একজন সেনার ‘উৎসবের গুলি’র বলি হয়? এই প্রশ্নের উত্তর নেই কোনো আদালতে, কোনো ন্যায়বিচারে।
গোলাম মাওলা আদালতে গেলেন। ড্যানি কারপিওর বিরুদ্ধে মামলা হলো, কিন্তু মার্কিন সেনাবাহিনীর আইনজীবীরা বললেন, “He was celebrating his homecoming.” শাস্তি হিসেবে ড্যানিকে সেনাবাহিনী থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে মাত্র তিন বছর পরই সে মুক্তি পায়।
কুইন্সের ওই ফ্ল্যাটে এখন অন্য কোনো পরিবার বাস করে। জানালার সেই কাঁচ বদলে গেছে। কিন্তু সেলিনার নামটি থেকে গেছে মানুষের হৃদয়ে। রাস্তার পাশের দোকানদার আজও মনে করে এক বাংলাদেশি নারী এখানে বেঁচে ছিলেন, যার জীবন শেষ হয়েছিল এক মাতাল সেনার “উদযাপনে”।









